ডার্ক ট্যুরিজম বা কৃষ্ণ পর্যটন!!পর্যটনের এক অজানা অধ্যায়

0
677

ডার্ক ট্যুরিজম (Dark Tourism) বা কৃষ্ণ পর্যটন: পর্যটনের এক অজানা অধ্যায়

পর্যটন শুধু পর্যটককে প্রকৃতির নান্দনিকতাই দেখায় না পর্যটন পর্যটকের সাথে বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের সম্পর্ক স্থাপন করে। আর ইতিহাস সব সময় সুখের হয় না দুঃখেরও হয়।

আসুন আজকে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই ট্যুরিজমের সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি বিষয়ের সাথে “ডার্ক ট্যুরিজম”! কি চমকে গেলেন তো!”ডার্ক” শব্দটি শুনেই কেমন “অন্ধকার” অথবা “ভুতুরে” গন্ধ পাওয়া যাচ্ছেনা? ভাবছেন ভুতুড়ে বাড়ি ঘুরতে যাওয়ার কথা বলবো? বিষয়টা কিন্তু একটু অন্যরকম। “ডার্ক ট্যুরিজম” কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে-
“Dark tourism can be defined as tourism associated with the visitation of that sites which have death, tragedy or suffering as their main theme”
তাহলে বুঝতেই পারছেন “ডার্ক” মানে “কালো”। আর “কালো” হচ্ছে শোকের প্রতীক। তাই নাম দেওয়া হয়েছে “ডার্ক ট্যুরিজম”। কোন স্থান বা স্থাপনার সাথে যখন অতীতের দূর্যোগ বা দুর্ভোগ বা মৃত্যুর ইতিহাস জড়িয়ে থাকে আর তা যখন পরবর্তিতে পর্যটনের উপাদান হিসাবে বিবেচিত হয় তখন তাকে Dark Tourism বা কৃষ্ণ পর্যটন বলে।

Abomb Dome Koichi Kamoshida

১৯৯৬ সালে ডার্ক ট্যুরিজম (Dark tourism) এর ধারণা প্রবর্তন করেন গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটির দুই ফ্যাকাল্টি সদস্য জন লেনন এবং ম্যালকম ফোলি। তাদের সংজ্ঞানুসারে, “দুর্যোগ এবং ট্রাজেডির সাথে সম্পর্কিত স্থানে ভ্রমণ করাকে ডার্ক ট্যুরিজম বলে।“ কোনো স্থান অতীতের ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে থাকলে তার প্রতি মানুষের কৌতূহল এবং তা দর্শন বা অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা ডার্ক ট্যুরিজমের অন্তর্গত। এই ভয়াবহতা হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা মানবসৃষ্ট নিষ্ঠুরতার কোনো ঘটনা। গোটা বিশ্ব জুড়ে রয়েছে ডার্ক ট্যুরিজমের অজস্র স্থান।

Auschwits Birkenau
Auschwits Birkenau
Auschwits Birkenau

এ স্থান হতে পারে সুনামি, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্পের আঘাতে বিধ্বস্ত কোনো এলাকা। যেমন- ২০১১ সালের সুনামিতে বিধ্বস্ত জাপান বা সাম্প্রতিক সময়ে জলোচ্ছ্বাস কবলিত ইন্দোনেশিয়ায়। অনেক ডার্ক ট্যুরিস্ট ত্রাণকার্যে সাহায্য করে থাকেন এ সময়ে।

ডার্ক ট্যুরিজম হতে পারে অতীতের বড় কোনো দুর্ঘটনাস্থলে, যেমন- চেরনোবিলের পারমানবিক বিপর্যয়ের নিদর্শন বা আবেরফানের বিপর্যয়।

কিন্তু ডার্ক ট্যুরিজম সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে মানুষের নিষ্ঠুরতার চিহ্ন যেখানে পাওয়া যায় সেখানে। যেখানে এক শ্রেনীর মানুষের উপর আরেক শ্রেণীর মানুষের চূড়ান্ত অমানবিকতার ইতিহাসের স্বাক্ষী পাওয়া যায়, সেখানেই ডার্ক ট্যুরিজমের প্রবল সম্ভাবনা।

আলমডাঙা বধ্যভূমি
আলমডাঙা বধ্যভূমি

নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের সাক্ষী পোল্যান্ডের অসউইৎজ ক্যাম্প, জাপানের আওকিগাহারা সুইসাইড ফরেস্ট, রুয়ান্ডার গণহত্যার মেমোরিয়াল, পারমাণবিক বোমায় হারিয়ে যাওয়া হিরোশিমা এবং নাগাসাকির ধ্বংসাবশেষ, ৯/১১ হামলার স্বাক্ষী গ্রাউন্ড জিরো- সবক’টি স্থানের একটি ক্ষেত্রে মিল আছে, প্রতিটি স্থান মানুষের বেদনার স্বাক্ষী। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডার্ক ট্যুরিজমের স্বার্থে নয়, বরং ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য যেসব জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোও ডার্ক ট্যুরিজমের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডার্ক ট্যুরিজমকে কি এখনো খুব অদ্ভুত এবং অপরিচিত কোনো বিষয় মনে হচ্ছে? মজার ব্যাপার হলো, আমাদের বাংলাদেশেই ডার্ক ট্যুরিজমের বেশ কিছু স্পট রয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, রায়ের বাজার বধ্যভূমি, ধানমন্ডি ৩২-এ আমাদের জাতির জনক “শেখ মুজিবুর রহমান” এর বাড়িটি সবই আমাদের দেশের ডার্ক ট্যুরিজমের অন্তর্ভুক্ত। তবে আমাদের দেশে যুদ্ধের যেই ভয়াবহতা ছিল সেই তুলনায় খুব কমই আমরা জনসম্মুখে তুলে আনতে পেরেছি।

চুকনগর বধ্যভূমি
চুকনগর বধ্যভূমি

পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম নিষ্ঠূরতম গণহত্যা হয়েছে ১৯৭১ সালে। যদি নৃশংসতার দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করি তাহলে দেখি ১৯৮১ সালের ইউএনএইচআরসি (ইউনাইটেড ন্যাশনস হিউম্যান রাইটস কমিশন) রিপোর্ট অনুযায়ী মানবসভ্যতার ইতিহাসে যতগুলো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তাতে অল্প সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষকে তখন হত্যা করা হয়েছিল বাংলাদেশে। গণহত্যার ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ গড়। তবে এখানে উল্লেখ্য, অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম রাতের প্রাণহানির সংখ্যাই ছিল কমপক্ষে ৩৫ হাজারের মতো। চুকনগর গণহত্যায় প্রাণহানি ঘটেছিল ১০ হাজারের ওপরে।

রায়ের বাজার বধ্যভূমি
রায়ের বাজার বধ্যভূমি


১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী ২৭ মার্চে প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজার। ১৯৭১ সালের সিডনি মরর্নিং হেরাল্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী মার্চের ২৫ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত (৫ দিনে) প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। এতে দেখা যায় দিনপ্রতি প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এমনকি রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র ‘প্রাভদা’ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসেই বাংলাদেশে ৩০ লাখ শহীদের বিষয়টি প্রকাশ করে। এই প্রাভদার ইংরেজি সংস্করণে উল্লেখ করা হয়, ‘Over 30 lakh persons were killed throughout Bangladesh by the Pakistani occupation forces during the last nine months’। প্রাভদা পত্রিকাটির ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারির বাংলা সংস্করণে শিরোনাম হয় ‘দখলদার বাহিনী বাংলাদেশে ৩০ লক্ষাধিক মানুষ হত্যা করেছে।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্‌ সাধারণ নাগরিক, মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী, সরকারি-বেসরকারি চাকুরীজীবী ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ধরে নিয়ে হত্যার জন্য কিছু নির্দিষ্ট স্থানকে ব্যবহার করতো যেগুলো পরবর্তীতে বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বিভিন্ন সময়ে দেশের ৩৫টি স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মোট কতগুলি স্থান বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সেই সংক্রান্ত কোনো তালিকা পাওয়া যায় না; তবে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এদেশে প্রায় ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করেছে। এরমধ্যে চট্টগ্রামে ১১৬টি স্থানকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। আবার, বাংলাদেশ সরকারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় মহান স্বাধীনতাযুদ্ধকালে পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত “বধ্যভূমিসমূহ সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ” নামের একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে যাতে প্রথমে দেশের ১৭৬টি বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে ১২৯টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ এবং সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এগুলো হলোঃ ঢাকা জেলায় ৮টি, রাজবাড়ী জেলায় ৩টি, ফরিদপুরে ৪টি, নরসিংদীতে ৪টি, মুন্সিগঞ্জে ৫টি, টাঙ্গাইলে ২টি, শেরপুরে ২টি, কিশোরগঞ্জে ১১টি, ময়মনসিংহে ৯টি, মানিকগঞ্জে ১টি, শরিয়তপুরে ১টি, গাজীপুরে ১টি, জয়পুরহাটে ৫টি, নওগাঁয় ৭টি, রাজশাহীতে ৩টি, নাটোরে ৬টি, পাবনায় ১টি, বগুড়ায় ৪টি, রংপুরে ২টি, লালমনিরহাটে ১টি, গাইবান্ধায় ৯টি, পঞ্চগড়ে ৪টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪টি, নীলফামারীতে ৬টি, দিনাজপুরে ১টি, চট্টগ্রামে ১১টি, সুনামগঞ্জে ২টি, হবিগঞ্জে ১টি, যশোরে ৩টি, ঝিনাইদহে ২টি, খুলনায় ২টি, পিরোজপুরে ২টি, বাগেরহাটে ১টি, ভোলায় ১টি করে বধ্যভূমি রয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের হত্যাযজ্ঞের স্থান গুলো যদি ট্যুরিজম ডেসটিনেশন হতে পারে তাহলে আমাদের দেশের গনহত্যার স্থান গুলো কেন ট্যুরিজম ডেসটিনেশন হবেনা? পোল্যান্ড যেমন তাদের উপর হওয়া নৃশংসতার স্বারক হিসাবে ক্রাকাওতে সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার মিউজিয়ামে হত্যাযজ্ঞের স্কাল্পচার তৈরি করে রেখেছে, তেমনি প্রতিটি বধ্যভুমিতে আমরাও কি আমাদের উপর হয়ে যাওয়া নৃশংস গনহত্যার স্কাল্পচার মিউজিয়াম কি তৈরী করতে পারি না?

এগুলোকে ডার্ক ট্যুরিজম ডেসটিনেশন করে ট্যুর প্যাকেজ তৈরি করে পৃথিবীর বিভিন্নদেশে প্রচার করলে আমাদের দুটো লাভ হতে পারে।
(১) বিদেশী রেমিটেন্স আসবে।
(২) বিদেশী লেখক, সাংবাদিক, গবেষকদের পাশাপাশি আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিদের লেখা লেখির কারনে ১৯৭১ গনহত্যাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় হবে।

সুতরাং পর্যটন মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ট্যুরিজম বোর্ড, পর্যটন কর্পোরেশন, সহ পর্যটন বিষয়ক সরকারি বেসরকারি, সংগঠন, গবেষক, শিক্ষক সকল প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে অনুরোধ করবো বিষয়টি ভেবে দেখতে। হয়তো গনহত্যার এসব স্থান দেখে একদিন দেশী-বিদেশী পর্যটকরাই দাবী তুলবে ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গনহত্যা দিবস করা হোক।

মাসুদুল হাসান জায়েদী
ভাইস চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরার অ্যাসোসিয়েশন- বিটিইএ।