যুব পর্যটন: বাংলাদেশের প্রাণশক্তি || মোখলেছুর রহমান ||

0
397

[বৈশ্বিক উন্নয়ন, নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ইত্যাদি কর্মে যুবাদের অংশগ্রহণের আহবান জানিয়ে ১২ আগস্ট ২০২০ তারিখে সারা বিশ্বে পালিত হলো ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’। বাংলাদেশের ৫ কোটি ৩০ লক্ষ যুবা নারী-পুরুষ জাতীয় জীবনে কতটুকু অংশগ্রহণ করতে পারছে আমরা জানি না। তাই পর্যটনের মাধ্যমে এদের আর্থিক, নৈতিক ও মানবিকভাবে ক্ষমতায়নের প্রয়াসে এই প্রবন্ধ রচনা করা হলো।]

উপক্রমণিকা:
তারুণ্যে ভরা সতেজ ও উদ্দীপ্ত সময়কেই আমরা যুবাকাল (Youth period) বলে চিহ্নিত করি। জীবনের এই সময়ে মানুষের গতি, দৈহিক দৃঢ়তা ও মানসিক শক্তি থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। একজন যুবা সমাজের চোখে কেবল একজন তরুণই নন, বরং তার দৃষ্টিভঙ্গি সামাজিক কাঠামোকে কীভাবে বিশ্লেষণ করে তা সকলের কাছে বিবেচ্য। যুগে যুগে তরুণরাই সমাজের প্রাচীনতাকে ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়ার ডাক দিয়েছে। তরুণদেরকে কখনোই প্রথাগত নিয়মে বেঁধে রাখা যায় নাই। তারা নিজেদের বুদ্ধিজ্ঞান দিয়ে নানারূপ সংস্কার করেছে ও নতুন পথের অনুসন্ধান করেছে। সমাজের জ্যেষ্ঠদের দায়িত্ব হলো ওদের পথরোধ না করে চলার পথে সহযোগিতা করা, যেন চলতে চলতে ভুল না করে বসে।

সরকারি হিসাব মতে, বাংলাদেশে যুবা নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৩০ লক্ষ। বলাই বাহুল্য যে, শ্রমশক্তির যোগান ও সংখ্যার বিবেচনায় দেশের উন্নয়নের জন্য যুবসমাজের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং দেশের জনসংখ্যার সম্ভাবনাময়, আত্মপ্রত্যয়ী, সৃজনশীল ও উৎপাদনক্ষম এ অংশকে জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারায় অবদান রাখার জন্য তাদের মাঝে গঠনমূলক মানসিকতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে সুশৃংখল কর্মীবাহিনী হিসেবে দেশের আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত করার অনুকূল ক্ষেত্র তৈরী করা একান্ত জরুরি।

যুবপর্যটনের ধারণা ও সংজ্ঞা:
The World Youth Student and Educational (WISE)-এর মতে যুবপর্যটন হলো পর্যটনের এমন একটি ভাগ, যখন অভিভাবকহীন অবস্থায় ১৫-২৯ বছরের যুবা নারী বা পুরুষ স্বেচ্ছায় অজানাকে জানার নেশায় উদ্ব্দ্ধু হয়ে জীবনধর্মী নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য অনধিক এক বছরের জন্য একক বা দলীয়ভাবে ভ্রমণে যায়। উল্লেখ্য, আমাদের জাতীয় যুবনীতি অনুসারে বাংলাদেশের ১৮-৩৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে যুবা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (UNWTO) এক রিপোর্টে যুবাপর্যটনকে দ্রুততম বর্ধনশীল শিল্প হিসেবে উল্লেখ্য করে বলেছে যে, ২০১৬ সালে যুবাপর্যটকদের সংখ্যা ছিলো মোট পর্যটকদের ২৩%। তাই যুবাপর্যটকে তারা দায়িত্বশীল পর্যটনের সবচেয়ে শক্তিশালী পর্যটন বলে অভিহিত করেছে এবং একে দিয়ে সমাজে শান্তি স্থাপনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। যুবাপর্যটনের জন্য পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে ইয়ুথ হোস্টেল, ব্যাকপ্যাকিং ট্যুরিজম, শিক্ষা পর্যটন, সাংস্কৃতিক বিনিময়, যুব উৎসব, রোমাঞ্চকর ভ্রমণ, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, ইন্টার্ণশীপ, বিশেষ ছাত্রবিমা, ইন্টারনেট ক্যাফে, ছাত্র বিনিময় কর্মসূচি, ভাষা শিক্ষা ইত্যাদি।

যুবপর্যটনের বৈশিষ্ট্য:
যুবাদের তারুণ্য আর অনুসন্ধিৎসা যুবপর্যটনের মূল চালিকা শক্তি। নতুনকে অনুসন্ধানের চিরন্তন আকাঙ্খা, সাহসিকতা ও ধৈর্য এদের ভ্রমণকে অর্থবহ করে তুলে। নিচে যুবপর্যটনের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরা হলো:

ক) বিভিন্ন ধরণের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয়, স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজে এবং গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হয়।
খ) এই ধরণের পর্যটন থেকে যুবাগোষ্ঠী স্বাগত মানুষের সাথে মিশে এবং তাদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
গ) যুবপর্যটন যুবাদেরকে ব্যাপকভাবে সামাজিকীকরণের সুযোগ দেয়।
ঘ) কমব্যয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এইধরণের ভ্রমণ করা যায় – যার প্রধান উদ্দেশ্য থাকে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও রোমাঞ্চ।
ঙ) যুবপর্যটনের ভ্রমণসূচি নমনীয় হয়।
চ) যুবারা এইধরণের পর্যটন থেকে সঞ্চিত অভিজজ্ঞতা অত্যন্ত যত্ন সহকারে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ধারণ করে।

যুবপর্যটনের প্রয়োজনীয়তা:
যুবাকাল হলো জীবনের তারুণ্যদীপ্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সময়ে একজন যুবা শান্তিপূর্ণ কাজের মাধ্যমে সমাজে শান্তি আনয়ন করতে পারে যা ভবিষ্যতে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যুবাগোষ্ঠী যুবপর্যটনের মাধ্যমে দেশে দেশে শান্তিতরী (Peace boat) নির্মাণ করতে পারে বলে গবেষকদের মত। নিচে যুবাপর্যটনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তাকে উপস্থাপন করা হলো:

ক) যুবপর্যটনের মাধ্যমে যুবাগোষ্ঠী নানাস্থানে গমনের ফলে তাদের মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তি জন্মায় যা উন্নয়ন ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রযোজ্য।
খ) যুবপর্যটন বৈশ্বিক জিডিপিতে বছরে ৩২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করে। তবে আর্থিক অবদানের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই পর্যটন যুবাদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে।
গ) যুবাপর্যটনের বাজার দ্রুতবর্ধনশীল। ১৯৯০ দশকে মোট পর্যটকদের ১৫% ছিল যুবপর্যটক। ঠিক পরের দশকে তা বেড়ে দাঁড়ালো ২০% এ। ২০১০ দশকে আবার বেড়ে দাঁড়ালো ২৩% এ। এই সংখ্যা বৃদ্ধি আমাদেরকে আশান্বিত করে।
ঘ) যুবারা বাড়ির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে দূরে ভ্রমণ করতে চায়। এতে করে নতুন অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলিকে সহজেই নিজ পরিবারের সাথে বিনিময়, যা তৃতীয় মাত্রায় শিক্ষালাভকে ত্বরান্বিত করে।
ঙ) যুবপর্যটন যুবাদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য অত্যন্ত গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে। এসব তাদের ক্যারিয়ার সৃষ্টিতে বিশেষ সহায়ক হয়।
চ) যুবারা ভ্রমণকালে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতেই বেশি পছন্দ করে। যা তাদের জীবন পরিচালনায় সিদ্ধান্ত ও ঝুঁকি গ্রহণে সহযোগিতা করে।

যুবপর্যটনের নৈতিকতা:
যুবপর্যটন পরিচালনার নামে কেনভাবেই গন্তব্যের সম্পদ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পরিবেশের উপর কোন প্রকার নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। তাই নিচের বিষয়গুলির প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে:

ক) যুবাপর্যটনে কোনভাবে মাদককে যুক্ত করা যাবে না।
খ) ভ্রমণকালে পর্যটন সম্পদের ব্যবহার, ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষার দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
গ) যে কোন মূল্যে জৈবিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তুরক্ষা করতে হবে।
ঘ) গণপর্যটন ও অতিপর্যটন (Mass tourism and Over tourism) পরিচালনা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ঙ) বিনোদনের সাথে শিক্ষাকে আবশ্যিকভাবে যুক্ত করতে হবে।
চ) স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, খাদ্য, ভাষা, পোষাক, ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।

বাংলাদেশে যুবপর্যটনের সম্ভাবনা:
১৯৯০ দশক থেকে বাংলাদেশে পর্যটন বিকশিত হতে শুরু করলে প্রথমেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বেশ পরিমাণে যুবাপর্যটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরা প্রতিবেশি দেশগুলিতে শিক্ষা সফরে যেতে শুরু করে। তখন এদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো হাতে গোণা। অতপর নতুন শতকে এদের সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায় এবং অভ্যন্তরীণ পর্যটনেও এরা নিজেদেরকে সংযুক্ত করে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বিজনেস এগ্রিকালচার এন্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি), পিপুলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যটনে পাঠদান শুরু করলে পর্যটন সকলের নজরে আসে। এই পর্বে কলেজের ছাত্ররা ভ্রমণের প্রতি বেশ আকৃষ্ট হয়। এরই মধ্যে আমাদের কয়েকজন যুবা নারী ও পুরুষ এভারেস্ট জয় করার পর সমস্ত যুবসমাজ রোমাঞ্চকর পর্যটনের হাত ধরতে নিজেদেরকে এগিয়ে নেয়। ফলে এদেশে যুবপর্যটন এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করতে শুরু করে। যুবপর্যটনের সম্ভাবনাকে বিশ্লেষণ করতে হলে, আগে বুঝতে এই পর্যটনের যুবাদের অংশগ্রহণের প্রকৃতি। নিচে এসব বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

ক) পর্যটনে অংশগ্রহণ: যুবা নারী ও পুরুষ নিজেদের ও অন্যের কমখরচে ভ্রমণসেবার জন্য অনলাইন ট্রাভেল গ্রুপ গড়ে উঠতে থাকে। বিস্ময়ের বিষয় যে, এখন সহস্ত্রাধিক অনলাইন ট্রাভেল গ্রুপ বাজারে কর্মরত। বাংলাদেশের যুবপর্যটনের এরাই এখন প্রাণ। জনশ্রুতিতে একথা প্রচারিত যে, বাংলাদেশে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের পরিমাণ প্রায় প্রায় ১ কোটি, যার অন্তত অর্ধেক যুবাপর্যটক। এ তথ্য সত্য হলে বাংলাদেশের যুবপর্যটন বিস্ময়কর ও আস্থার নতুন প্রতীক। বিশেষত ভবিষ্যৎ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে এদের অংশগ্রহণ হবে ও অবদানমুখী। উল্লেখ্য যে, এদের অধিকাংশই পাহাড়, ঝর্ণা, খুম, বাগান, নদী, বিল, সৈকত, হাওর, লেক,বিল ও চর ভ্রমণে যায় বলে আমাদের যুবসমাজ প্রকৃতির কাছ থেকে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা ও সম্পদ সংরক্ষণের উপায় শিখছে। পর্যটনের এই পাঠ একটি মানবিক ও সৃজনশীল জাতিগঠনে অবশ্যই ফলদায়ক হবে। যুবাদের পছন্দের অনুগন্তব্যের একটি তালিকা উপস্থাপন করা হলো:

পাহাড়: কেওকারাডং, যোগিযতলং, সাকাহাফং, মায়াতং, তাজিনডং, দুমলং, কালাপাহাড়, পাথারিয়া ইত্যাদি।
ঝর্না: খইয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, কমলদহ, সীতাকুন্ড সুপ্তধারা, সহস্রধারা, জাদিপাই, তলাবং, হামহাম ইত্যাদি।
খুম: নাফাখুম, আমিয়াখুম, ভেলাখুম, দেবতাখুম ইত্যাদি।
বাগান: পেয়ারা বাগান (স্বরূপকাঠি), গোলাপ বাগান (সাদুল্লাপুর), শিমুল বাগান (সুনামগঞ্জ), লটকন (নরসিংদী), সুর্যমুখি বাগান ইত্যাদি।
নদী: পদ্মার মৈনট ঘাট ও মাওয়া ঘাট, ঢাকা-চাদপুর নৌ-ভ্রমন, বালু নদীতে নৌ-ভ্রমন, বৈদ্যের বাজার, সাঙ্গু নদী, মেঘনা নদী, বরিশাল নৌ ভ্রমণ ইত্যাদি।
সৈকত: গুলিয়াখালী বিচ, বাঁশবাড়িয়া বিচ, তারুয়া বিচ, শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, চর বিজয় সৈকত, সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত, বিহঙ্গ সমুদ্র সৈকত, পার্কি বিচ ইত্যাদি।
হ্রদ বা লেক: কাপ্তাই লেক, ফয়স্ লেক, মহামায়া লেক, নীলাদ্রি লেক, ধানমন্ডি লেক ইত্যাদি।
হাওর: টাংগুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, নিকলী হাওর ইত্যাদি।
বিল: চলন বিল, বেলাই বিল, আড়িয়াল বিল, বাইক্কা বিল, শাপলা বিল, পদ্মবিল ইত্যাদি।
দ্বীপ ও চর: বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড, বিজয় চর, আশার চর, মাঝের চার, চালচর, মনপুরা চর, চর কুকরি মুকরি, সোনার চর, নলবুনিয়ার চর, যমুনার চর, মঘনার চর ইত্যাদি।
নোনাবন: রাতারগুল ইত্যাদি।

খ) কর্মী ও উদ্যোক্তা: বাংলাদেশের কর্মপ্রত্যাশী সৃজনশীল যুবসমাজ নিজেদেরকে সুসংগঠিত, সুশৃংঙ্খল এবং উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি পর্যটনের নানা উপখাতে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। যতদূর জানা যায়, কোন প্রকার প্রাতিষ্ঠনিক ঋণ সহযোগিতা ছাড়াই একদল উদ্যমী, সাহসী ও সৃজনশীল যুবক সাজেকের শতাধিক রিসোর্টে, টাংগুয়ার হাওরের ২০টির অধিক আধুনিক পর্যটনতরী নির্মাণে, ১০ টি কায়াকিং পয়েন্টে কায়াক স্থাপনে এবং সারাদেশে অন্তত ২৫টি ক্যাম্পিং পয়েন্টে একক বা যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছে। এর মাধ্যমে যুবারা বাংলাদেশের পর্যটনের অপ্রচলিত খাতে ও অপরিচিত নতুন গন্তব্যে বিনিয়োগ বিষয়ে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এই শিক্ষা অবশ্যই আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে। এখান থেকে যুবপর্যটনের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিশ্চয়ই কিছু আগাম ধারণা পাওয়া যায়।

গ) পর্যটন সংস্কারের অগ্রপথিক: খুবই সত্য কথা যে, আমাদের যুবারা পর্যটন জেনে যতটা পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে – তার চেয়ে বেশি করছে অন্তরের আকুতি দিয়ে। এরা নিজেদেরকে প্রাণপণে সম্পৃক্ত করতে চায়, তাই এদেরকে গড়ে তোলা সহজ। উল্লেখ্য, পর্যটনকে এদেশে শিল্প ঘোষণা করা হলে আমাদের যুবারা নিজেদেরকে সম্মানিত বোধ করবে। পর্যটনকে রপ্তানিখাত হিসেবে ঘোষণা করলে এবং এদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করলে এরাই হয়ে উঠবে আমাদের পর্যটনের প্রধান প্রাণশক্তি। বিশ্বাস করার সঙ্গত কারণ আছে যে, এরা পর্যটন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকদেরকে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে যা ইতোপূর্বে ঘটে নাই। সরকারকে শুধু পৃষ্ঠপোষকতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে এরাই ছুটে যাবে পর্যটন উৎপাদনকারী দেশগুলিতে এবং বাংলাদেশকে প্রমোশন ও মার্কেটিংয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য সরকারের ধীর পদক্ষেপের দিকে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকতে হবে না। হাজার তাত্বিক বাঁধা থাকা সত্বেও কেবল যুবাদের কার্যক্রমের জন্য বিদেশি পর্যটকরা বাংলাদেশকে অন্যতম পর্যটন গন্তব্য হিসেবে বেছে নিবে।

কর্পোরেট পর্যটন বনাম যুবপর্যটন:
পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, ১৯৯০ দশক থেকে বাংলাদেশে যে পর্যটনের বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু এই দেশের পর্যটন বিকাশের সূচনা হয়েছে কর্পোরেট পর্যটনের হাত ধরে। এই কারণে বাংলাদেশের পর্যটনে শিক্ষা, গবেষণা, নীতি ও পরিকল্পনা নির্ধারণ, জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে কর্পোরেট ব্যবসায়িরা প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তারা কোনভাবেই বুঝতে চায় না যে, পর্যটন কেবলই ব্যবসায় নয় – বরং শিক্ষা, নৈতিকতা ও দর্শন পর্যটনের প্রাণ। সমাজ গঠন ও সামাজিক প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণে রয়েছে পর্যটনের অসামান্য ভূমিকা। আজকের যুবসমাজ পর্যটন থেকে কেবল কর্পোরেট বাণিজ্যের শিক্ষা গ্রহণ করলে এবং অনুশীলন করলে তা আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্র ভারসাম্যহীন প্রভাবের সৃষ্টি করবে। আশার কথা যে, বাংলাদেশের যুবপর্যটন এরই মধ্যে পর্যটনের কর্পোরেট ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে কমিউনিটি পর্যটনের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। তাই এরা অল্প পুঁজি দিয়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক পুঁজি ব্যবহার করে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে নতুন প্রয়াসকে সফল করছে। বিনিময়ে পর্যটকরা পাচ্ছেন সাশ্রয়ী পর্যটন। ফলে দিনে দিনে এদেশে অভ্যন্তরীণ যুবপর্যটকদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সারা পৃথিবীতে মোট পর্যটকদের মাত্র ২৩% যুবপর্যটক হলেও বাংলাদেশে এদের সংখ্যা কোনভাবেই ৫০%-এর কম নয়। তাই এখনই উচিত ‘জাতীয় যুবপর্যটন নীতি’ প্রণয়ন করে তা দ্রæত বাস্তবায়ন করা। বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ কার্যক্রম, শিক্ষা, উন্নয়ন, গবেষণা ও সম্প্রসারণে অংশগ্রহণ ইত্যাদিকে একটি সমতাপূর্ণ রূপরেখার মধ্যে আনতে হবে এখনই। গন্তব্যে পর্যটন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষার জন্য যুবপর্যটনে গণপর্যটনকে যতটা সম্ভব নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং পর্যটন নৈতিকতাগুলি স্পষ্টীকরণ করতে হবে। এইজন্য দরকার সচেতনতা ও গন্তব্য ব্যবস্থাপনার কৌশল এবং পর্যটন সেবার উৎপাদন, ক্রয় ও পরিবেশনের রীতিকৌশল নিয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা গ্রহণ।

যুবপর্যটনের চ্যালেঞ্জ:
যুবপর্যটনের দ্রুত উত্থান ও বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে এর প্রভাব নীতি নির্ধারকদেরকে খানিকটা ভাবাচ্ছে বৈকি! দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য এর সাথে বেশ কিছু নেতিবাচক বিষয়ের সম্পৃক্ততা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেগুলি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না আনতে পারলে যুবপর্যটন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এইজন্য প্রয়োজনে গন্তব্যভেদে নতুন আইন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নৈতিক মানদন্ড চালু করা উচিত। নিচে কয়েকটি বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

ক্লান্তি: সতর্ক থাকতে হবে এইমর্মে যে, একটি গন্তব্যে ধারণ ক্ষমতার বাইরে মাত্রাতিরিক্ত পর্যটক ও পর্যটন কার্যক্রম পরিচালিত হলে উক্ত গন্তব্য ও স্বাগত জনগোষ্ঠী অধিক সেবাপণ্য উৎপাদন ও সেবা প্রদান করে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। ফলে তারা উৎপাদন ও প্রদানের মান ধরে রাখতে পারে না। তাই পর্যটন পরিচালনার পূর্বে যুবাদেরকে গন্তব্যের সম্পদ, প্রকৃতি, স্বাগত জনগোষ্ঠী, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল এবং সর্বোপরি উক্ত গন্তব্যের ধারণ ক্ষমতা জেনে পর্যটন পরিচালনা করতে হবে।

নেতিবাচক পরিবেশগত পরিণতি: গণপর্যটন ও অতিপর্যটন পরিচালনা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইকো-গণপর্যটন পরিচালনাকালে জৈবিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। পর্যটকদের এমন কোন অবদার রক্ষা যাবে না বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এমন কোন প্রতিশ্রুত বা কর্মকান্ড পরিচালনা করা যাবে না, যা পরিবেশ, প্রতিবেশ ও বাস্তুর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষত, মাটি, পানি ও শব্দ দূষণ এবং গ্রীণ হাউজ গ্যাসসহ অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে বায়ু দুষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে। কেননা, পর্যটনসম্পদ ভঙ্গুর এবং বহুবার ব্যবহার করতে হয়। এই সকল সম্পদ বিনষ্ট হলে আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না।

অনৈতিক কার্যাবলি: যুবামানসের জন্য পর্যটনকালে কখনো কখনো জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে কিছু অনৈতিক কাজ সম্পাদিত হয় বলে গবেষকগণ বলছেন। যেমন মাদকের বহন, ব্যবহার ও বেচাকেনা এবং নারীদেরকে যৌনকাজে উৎসাহিত করা ইত্যাদি। কঠোরভাবে এই সকল অনৈতিক কার্যাবলি যুবপর্যটন থেকে বিদায় করতে হবে। অন্যথায় বিকাশমান ও সম্ভাবনাময় যুবপর্যটন ভেঙ্গে পড়বে। এই ক্ষতি একটি জাতি-গোষ্ঠীর জন্য হবে অপূরণীয়।

শেষকথা:
যুবপর্যটকদের সংখ্যা, পর্যটনে সৃজনশীল বাণিজ্য সৃজন ও বিনিয়োগে যুবাদের অংশগ্রহণ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে – যা আশার প্রাণশক্তিও বটে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ও আত্মপ্রত্যয়ী যুবারা প্রথাগত উন্নয়নের সকল রীতিকৌশল ভেঙ্গে দিয়ে পর্যটনকে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধানতম হাতিয়ার হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হবে। কেবল দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধই নয়, এরা পর্যটনকে নিয়ে যাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বর্ণ শিখরে। সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে এরা রাখতে টেকসই অবদান। এসব এখন কল্পচিত্রের মতো মনে হলেও ঘটনাচক্র বলছে তা বাস্তবে প্রতীয়মান হবে। তবে সরকারকে তার মমতার হাত বাড়িয়ে এদেরকে লালন করতে হবে; দিতে হবে সুযোগ, স্বীকৃতি ও একটুখানি প্রশ্রয় – যেমনটি আমরা সন্তানদেরকে দিয়ে থাকি। আদর করি, শাসন করি; আবার একা ছেড়ে দিয়ে পথ চলতে সহযোগিতা করি। পরিবারের এই ছোট্ট শিক্ষাটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনুশীলন করতে পারলে ৫ কোটি ৩০ লক্ষ যুবাদের মধ্য থেকে বাংলাদেশের পর্যটনে অগণিত ‘নতুন যৌবনের পর্যটনদূত’ সৃষ্টি হবে – যারা সামাজিক ভঙ্গুরতাকে প্রতিহত করে শান্তির নৌকা সৃজন করবে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বায়নের প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের যুবপর্যটন হতে পারে অদ্বিতীয় ব্রহ্মাস্ত্র।

লেখক, আহ্বায়ক সম্মিলিত পর্যটন জোট।