পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা তমা

0
887

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী এবং পর্যটন উদ্যোক্তা তাহসিন ইসলাম তমার পথচলার গল্প।

তাহসিন ইসলাম তমা ১৯৯৫ সালে ঢাকায় সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম রাজধানী ঢাকাতে হলেও পৈত্রিক নিবাস প্রাচীন বঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে। বাবা ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একজন কর্মকর্তা এবং মা গৃহিণী। বাবার চাকরি সূত্রেই মূলত তমার ঢাকায় বসবাস এবং বেড়ে ওঠা। তিন বোন এর মাঝে কনিষ্ঠ তমা কিছুটা ডানপিটে স্বভাবের। বাবার চোখের মনি তমা এবং তাদের হাসিখুশি মাখা সুখের সংসার ছিল। ১৯৯৭ সালে হঠাৎ সুখের সংসারে অমানিশার অন্ধকার নেমে আসে, তমার বাবা স্ট্রোক করেন এবং প্যারালাইজড হয়ে যান। শুরু হয় জীবন সংগ্রামের প্রথম অংশ। ১৯৯৮ সালে তমার বাবা মারা যান, ৩ বোনকে নিয়ে তার মাকেই সংসারের হাল ধরতে হয়। ঢাকার মৌচাকে অবস্থিত মনি-মুকুর স্কুলের মাধ্যমে শিক্ষা জীবনে পা দেন তমা। ২০১০ সালে সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এস.এস.সি পাশ করেন এবং ২০১২ সালে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ থেকে একই বিষয়ে এইচ.এস.সি পাশ করেন।

এইচ.এস.সি পরীক্ষা শেষ করেই লা-রিভ ফ্যাশন হাউসে বিক্রয় কর্মী হিসেবে যোগদান করেন। রেজাল্ট বের হওয়ার পর সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন।এরই মধ্যে লা-রিভ ফ্যাশন হাউসে পদন্নোতি হয় তমার। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ও চাকরি এক সাথে হয়ে না উঠায় চাকরি ছেড়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করেন। ছোট থেকে টুকটাক শখের বশে রান্না করতেন তবে নিয়মিত করতেন না।

২০১৪ সালে মেঝ বোনের বিয়ে হওয়ায় এবং বড় বোন সংসারের হাল ধরতে চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সংসারের রান্নার দায়িত্ব তমার কাঁধে চাপে। রান্না খারাপ হওয়ায় মাঝ মাঝে মায়ের বকুনি খেতেন যে তমা, রান্নাকে পেশা হিসেবে বেছে নিবে সেটা কখন ভাবেননি। ২০১৬ সালে মোহাম্মদপুরে অবস্থিত “প্রিন্স বাজার” পিঠা উৎসবে ১২ রকম পিঠা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন এবং ৭ম স্থান অর্জন করেন। অনার্সের শেষ বর্ষে তমা যখন পড়াশোনার চাপে সে সময় ২০১৬ সালের শেষ দিকে তমার মা ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পারিবারিক অভিভাবক বলতে তমার বড় বোন। ২০১৭ সালে ৪/৫ জনের থেকে টাকা ধার নিয়ে ২০ রকমের পিঠার পরসা সাজিয়ে মজপিঠা উৎসবে অংশ গ্রহণ করেন এবং প্রশংসিত হন। মজপিঠা উৎসব থেকেই বিভিন্ন অর্ডার পেতে থাকেন। এরপর একে একে রূপচাঁদা নবান্ন উৎসব, জাতীয় পিঠা উৎসব, প্রাণ নবান্ন উৎসব এবং প্রিন্স বাজার পিঠা উৎসব এ যোগ দেন। ২০১৮ সালে প্রাণ প্রিমিয়াম ঘি ঐতিহ্যের ঘ্রাণ সিজন-৩ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং ২য় স্থান অর্জন করেন। ২০১৮ সালে আপডেট হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউট থেকে ফুড এন্ড বেভারেজ শর্ট কোর্স করেন, একই সাথে মিশুক একাডেমী থেকে মোগলাই কুসিন এর উপর শর্ট কোর্স করেন।একই বছর মিজান পাম-অলিন সেরা রন্ধন শিল্পী প্রতিযোগিতায় সেরা ২৪ এর একজন হন। ২০১৯ সালে প্রিন্স বাজার পিঠা উৎসবে অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন, তারপরই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন।

কলেজ জীবনে Tahshins R Kitchen নামক অনলাইন প্লাটফর্মে তমা হোমমেড ফুড ক্যাটারিং ব্যবসা স্বল্প পরিসরে চালু করেছিলেন। বর্তমানে হোমমেড খাবার তৈরি ও সরবরাহের পাশাপাশি এটিএন বাংলার রিয়েলিটি শো মিজান পাম-অলিন সেরা রন্ধন শিল্পী ২০১৯ প্রতিযোগিতার সেরা ৪ এর একজন প্রতিযোগী, করোনার কারণে চূড়ান্ত রাউন্ড বন্ধ আছে। এখন ক্যাটারিং বিজনেস ভালো ভাবেই চালাচ্ছেন। প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ জনের খাবার নিজহাতে করে থাকেন। তমার কোন সহযোগী না থাকায় বড় অর্ডার হলে ৩ দিন আগে কনফার্ম করতে হয়। তরুণ এই পর্যটন উদ্যোক্তা অনেক বড় পরিসরে কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। ব্যক্তিগত জীবনে রান্নার পাশাপাশি ঘুরতে বেশ ভালো-বাসেন তাই রান্নার পাশাপাশি আগামী দিনে ট্যুর-অপারেট করতে চান।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ তাহসিন ইসলাম তমার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে তমার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। তমার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।