পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা ড চিং চিং

0
812

ভুমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রানান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন সুভেনির নির্মাতা ও সরবরাহকারী, ইকো কটেজ ওনার, পর্যটন উদ্যোক্তা ড চিং চিং কে।

ড চিং চিং পাহাড়, ঝর্না, চির-সবুজ এবং পর্যটকদের প্রথম পছন্দের জেলা সাঙ্গু নদী বিধৌত বান্দরবানে জন্মগ্রহন করেন। শৈশব কৈশোর কেটেছে টিলা, ঝিরিপথ আর সবুজ অরণ্যে হেসেখেলে। ড চিং চিং ২০০৩ সালে বান্দরবান সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন, এবং ২০০৫ সালে বান্দরবান সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।এরপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য পাড়ি জমান ঢাকা। ২০০৬ সালে ইডেন মহিলা কলেজে পড়া অবস্থায় কিছু পার্টটাইম চাকরি করতেন এবং ইডেনের নানা আয়োজনে অংশগ্রহণ করতেন। অবশেষে ২০১১ সালে ইতিহাস বিভাগ থেকে অনার্স- মাস্টার্স শেষ করে শিক্ষাজীবনের ইতি-টানেন।

সবার মা- বাবাই ছেলে মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন। ড চিং চিং এর বাবা সেনাবাহিনীর সদস্য হবার কারনে নিতান্তই তাদেরও ইচ্ছা ছিলো মেয়ে যেন একজন আর্মি’র অফিসার হন। তবে ছোট বেলা থেকে অনেক আদরে বড় হবার কারনে তাদের এই স্বপ্ন ড চিং চিং পূরন করতে পারেন নি। ড চিং চিং এর নিজের স্বপ্ন ছিল একজন শিক্ষক হবার, তবে শিক্ষক না হলেও এখন তিনি একজন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। পড়াশোনা শেষ করার পর ড চিং চিং কদিন সরকারী ও বেসরকারী চাকরীর পেছনে অনেক দৌড়ঝাপ করার পরও যখন পেলেন না তখন ভেংগে না পড়ে নিজে কিছু করার জন্য উদ্যোগ নিলেন।প্রতিষ্ঠা করলেন নিজের অনলাইন প্রতিষ্ঠান “ফিনারী”। ফিনারীর যাত্রা শুরু করেন ২০১৬ সালে । প্রথম থেকেই ফিনারী’র শুভানুধ্যায়ীদের ভালবাসায় চলার পথ মসৃন হয়।

২০১৪ সালে সংসার জীবন শুরু করেন, এবং ২০১৫ সালে ড চিং চিং এর কোল আলো করে একটি সন্তান আসে।শুরু হয় অনাগত সন্তানকে নিয়ে সংসার জীবনের নতুন সংগ্রাম।সমস্ত মেধা প্রজ্ঞা শ্রম দিয়ে ফিনারীকে তিলতিল করে বড় করতে থাকেন। ফিনারী শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানই নয় এটি একটি প্রচেষ্টা। বলা চলে শখ থেকে স্বপ্নের শুরু করেন তিনি। ফিনারী শুরুর গল্পটি এক লাইনে ঠিক এভাবেই বলা যায়। তবুও একটু খুলে না বললেই নয়। ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পর্ব চুকিয়ে চাকরির বাজারে যে ঢুঁ মারেন নি তা কিন্তু নয়। বরং বেশ শ্রম ঢেলেছেন যুতসই একটা চাকরি পেতে। কিছুটা সময় চাকরিও করেছেন ৯টা-৫টার হিসাব অনুযায়ী। সম্পূর্ণ শূন্য থেকেই শুরু করেছিলেন তিনি। সে সময় পুঁজি বলতে ছিল তার আগ্রহ আর শখ। কেননা শুরুতে পুরনো আর ফেলনা জিনিস থেকেই নতুন কিছু তৈরি করতেন সুভেনির।

২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফেসবুকে ফিনারী নামে একটি পেজ খুলেন। সেখানেই তৈরি পণ্যগুলোর ছবি তুলে আপলোড দেয়া শুরু করেন। সাধারণ কাচের বোতলের ওপর আস্ত একটা রিকশা কিংবা শখের টিনের জুয়েলারি বাক্সটির উপরে লাল, হলুদ, সবুজে আঁকা ফুল লতাপাতা ক্ষণিকেই যেন বদলে দেয় পণ্যের ম্যাড়মেড়ে ভাব। এখানেই শেষ না কখনো বা দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যের ওপর শোভা পায় বাংলা চলচ্চিত্রের পোস্টার, নান্দনিক কোনো নকশা। মজার বিষয় হচ্ছে এসবের পুরোটাই কিন্তু করা হয় রিকশা পেইন্টে। জাপানি পর্যটকদের এই পেইন্টিং অসম্ভব জনপ্রিয়। সেক্ষেত্রে কাচের বোতল, টিনের বাক্স, আয়না কিংবা শাড়ির আঁচল সবকিছুই যেন ক্যানভাস ওঠে ফিনারী’র ছোঁয়ায়। ক্যানভাসের ওপর রঙ-তুলিতে ফুটিয়ে তোলা হয় নকশা। ধীরে ধীরে ফিনারীর গ্রাহকদের চাহিদা বাড়তে থাকে, সঙ্গে বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিধিও। শূন্য থেকে শুরু হওয়া ফিনারীর এখন নিজস্ব কারখানা রয়েছে। নকশাকার থেকে শুরু করে ডেলিভারি ম্যানসহ মোট ১৭ জন কর্মী কাজ করছে।

ফিনারী’র প্রথম আউটলেট উদ্বোধন করা হয় ২রা আগস্ট, ২০১৯ সালে। ল্যাটিন শব্দ ফিনারী’র অর্থ সূক্ষ্ম কারুকাজ। নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন নাম চাচ্ছিলেন যা পুরোপুরিই অর্থ বহন করে ড চিং চিং এর কাজের। সবমিলে ফিনারী নামটিকেই যথাযথ মনে হয়েছিল। কেননা সূক্ষ্ম নকশা, কারুকাজ এসবই কিন্তু প্রাধান্য পায় তার পণ্যগুলোয়। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ফ্যাশন যেমন তিনি জনসাধারণের কাছে পরিচিত করে তুলতে চান, তেমনি বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের কাছে রিকশা পেইন্টকে পরিচিত করে তুলতে চান। এই চিন্তা থেকে নিজ জন্মস্থান বান্দরবানের খুব জনপ্রিয় জায়গা থানছিতে ড চিং চিং ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে শুরু করেন একটি পর্যটন ইকো কটেজ। থানছি বাজারের ঠিক উপরের টিলাতে ইকো কটেজটির অবস্থান। কটেজের কাজ শেষ হলেও করোনা পরিস্থিতির কারনে বন্ধ আছে।তবে দেশের পরিস্থিতি ঠিক হয়ে গেলে ইকো কটেজটির সুন্দর একটি নাম দিয়ে উদ্বোধন করবেন। কটেজের পরিবেশ থাকবে সম্পূর্ণ পাহাড়ি সংস্কৃতির আদলে। কটেজে থাকবে ফিনারীর একটি ডিসপ্লে সেন্টার।

উপসংহার; ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ ড চিং চিং এর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে ড চিং চিং এর যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রানান্তর চেষ্টা করে তার সোনালি স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। ড চিং চিং এর এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।