পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা জেসী

0
857

ভুমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রানান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী, পর্যটন উদ্যোক্তা জেসমিন আকতার জেসীকে।

জেসী ১৯৮৭ সালে চট্রগ্রামের মিরসরাইয়ে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। বাবা ছিলেন ইটালি প্রবাসি। তাই মায়ের হাতে তার শিক্ষা জীবনের শুরু হয়।পাঁচ ভাই বোনের মাঝে জেসী সবার ছোট ও খুব আদরের মেয়েছিলেন।জীবনে চলার পথে খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারান।স্কুলে পড়ার সময় বাবা টিচারকে একদিন বললেন আমার মেয়েটা বড় মানুষ হবে আপনি দেখে নিয়েন স্যার। বাবার দেখার আর সুযোগ হয়নি। জেসী যখন নবম শ্রেণিতে পড়েন তখন বাবা মারা যান। এরপর পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে নিয়ে ভাবতেন সুমুদ্র পাড়ের মেয়ে জেসী।আর নতুন কিছু করার চেষ্টায় মগ্ন থাকতেন। জেসমিন আকতার জেসী ছোটবেলা থেকে সেলাই, ব্লক, বাটিক, বুটিকছের, ক্রিস্টাল পাথর, মোম ইত্যাদি ও রান্না নিয়ে প্রচন্ড আগ্রহী ছিলেন। তবে পড়াশুনার পাশাপাশি সেদিকে পুরপুরি মনোযোগ দেয়া হয়ে উঠেনি।

‘উদ্যোক্তা’ হওয়া খুব বড় একটা ব্যাপার। কখনো নিজে এই পরিচয়টা ধারন করতে পারবেন ভাবেন নি। অবশ্য ভাবেন নি বললে ভুল হবে, মনে-প্রানে চাইতেন নিজের একটা আইডেন্টিটি, একদম অন্যরকম হবে সেটা। কিন্তু কিভাবে তা জানতেন না, কারন প্রচন্ডরকম রক্ষনশীল পরিবারে জেসীর বেড়ে ওঠা, গতানুগতিকতার বাইরে কিছু চিন্তা করার সাহস হতো না।


কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত আর জেসীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কারনে আজ তিনি বলতে পারেন, তিনি সফল পর্যটন উদ্যোক্তা। ছোট বেলা থেকে রান্না নিয়ে ক্রিয়েটিভ কিছু করা প্লেটিং, বেকিং, বল্ক, বাটিক, সেলাই এগুলো ভালো লাগতো। পএিকায় নতুন রেসিপি পেলে সেটা নিজে করার চেষ্টা করতেন। জেসীর রান্নার হাতেখড়ি মায়ের কাছে, মুলত। মায়ের কাছে সব কিছু শেখা।

জেসী হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে ২০০০ সালে পি এইচ আমীন একাডেমী থেকে এসএসসি পাস করেন। একাউন্টটিং ও গার্হস্থ্য অথর্নীতিতে ক্রিয়েটিভ প্লেটিং এর জন্য লেটারমার্ক পান। এতে করে সপ্নটা বড় করে দেখতে এবং নিজের প্রতি একটু কনফিডেন্ট বেড়ে যায়।২০০২ সালে ডাঃ ফজলুল হাজেরা ডিগ্রি কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে এইচএসসি পাশ করেন। চট্রগ্রাম সিটি কলেজে অর্নাসে ভর্তি হওয়ার পর পারিবারিক ভাবে বিয়ের আয়োজন করেন এবং ১ম সেমিস্টারে পড়াশোনায় ইতি টানেন। ২০০৫ সালে প্রথম সন্তান জন্ম দান করেন।

২০০৩ সালে চট্রগ্রামে সিঙ্গার বাংলাদেশ থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ এবং রান্নার প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের বাসার ড্রইং রুমে ঈদে ছোট পরিসরে শোরুম গড়ে তোলেন। ব্লক,বাটিক, থ্রীপিস, হাতের কাজের শাড়ী, ক্রীস্টাল, মোম ইত্যাদি ভালো সেল হতো। এইচএসসিতে ভাল রেজাল্ট হওয়ায় দেখতেন চার্টার একাউন্টটিং এ পড়ার। মানুষের সব সপ্ন কখনো কখনো পূরন হয়না। শশুর বাড়িতে কেউ পড়তে দিবেনা তাই নিরবে কান্না করতেন আর ভাবতেন হয়তো বাবা থাকলে এমনটা হতো না। মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়া আসলে পাশ্চাত্য সমাকে কঠিন। জেসীর শুশুর বাড়ির লোকেরা রান্নার জন্য প্রশংস্যা করতেন সেটাই তার ভরসা। জেসীর বোনের ছেলেটা একদিন আমার একটা আইডি ও অনলাইন পেজ খুলে দেয় Jasy’s Kitchen নামে, শুরু হয় নতুন পথচলা। চট্রগ্রামের একটা রান্নার গ্রুপে কনটেস্টে অংশগ্রহণ করেন এবং জেসীর একটা ডের্জাট ১ম হয়। এরপরই রান্নার বিভিন্ন গ্রুপে অংশ নেওয়া চলতে থাকে।এর মাঝে দ্বিতীয় সন্তান আসে আমার কোল জুড়ে। কিছুদিন পর নতুন করে আবার সপ্ন দেখেন নিজেকে রন্ধন শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে।

২০১৭ সালে ডিপ্লোমা ডের্জাট কনটেস্টে চট্রগ্রামে ৩য় স্হান অর্জন করেন। ২০১৮ সালে মিজান পামঅলিন রন্ধন শিল্পীতে পুরো বাংলাদেশ থেকে টপ সেভেন হন। এরমাঝে বিভিন্ন পএিকায় রেসিপি দিয়ে থাকেন। ২০১৯সালে Nutri Chem থেকে জেসী চট্রগ্রাম থেকে প্রথম হন।এর মাঝে বেকিং এর ক্লাস শুরু করেন এবং বিভিন্ন অর্ডার নিয়ে কাজ করতে থাকেন। ২০১৯ সালে আর ও একটি পোল্ট্রি কুকিং কনটেস্ট সম্মাননা পান। ২০১৯ সালে ডিপ্লোমা মিষ্টি লড়াইয়ে সেমিফাইনাল রাউন্ডে সিলেক্ট হন চট্টগ্রাম থেকে। এর মাঝে প্রথম আলো, দৈনিক পূর্বকোণ,দৈনিক ইওেফাক, ভোরের কাগজ, যায়যায় দিন, ডেইলি অবজারভার সহ বিভিন্ন পত্রিকায় রেসিপি লিখেন নিয়মিত। একবার চ্যানেল আই এর ডেকো নুডুলসের প্রোগ্রামে সিলেক্ট হয়ে অংশ নেন।এছাড়া বিটিভি, চ্যানেল আই, এটি এন বাংলায় প্রোগ্রাম করেন। জেসীর ছেলে উনার বেকিং ও রান্নার প্রডাক্ট গুলো ব্যাপক ভাবে প্রচারের জন্য গুগোল, ইউটিউব সহ আরো কিছু সামাজিক মাধমে একাউন্ট খুলে দিলে প্রচার প্রসার এখন আগের থে অনেক বেশি। Jasy’s Kitchen থেকে অনলাইনে সব ধরনের হোমমেড ফুড সরবরাহ করেন।২০২০ সালের শুরুতেই ইটালিয়ান রেসিপিতে ২ বার গোল্ড এওয়ার্ড পেয়েছেন। জেসী দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন যেন আগামী আদিবাসী ফুড নিয়ে কাজ করতে পারেন।

উপসংহার; ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ জেসমিন আকতার জেসীর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে জেসীর যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রানান্তর চেষ্টা করে তার সোনালি স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। জেসীর এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।