বলিভিয়ায় প্রথমবারের মতো বিজয় দিবস উদ্‌যাপন

0
66

বলিভিয়ায় প্রথমবারের মতো উদ্‌যাপিত হয়েছে বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস। ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে দেশটিতে বিজয় দিবস উদ্‌যাপন করা হয়।

ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসের আওতাধীন ছয়টি দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে জাতীয় দিবসগুলো উদ্‌যাপন, তাঁদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও দূতাবাসের কনস্যুলারসহ সার্বিক সেবা প্রবাসী বাংলাদেশিদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াসের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গত দুই বছরে এ দেশগুলোর বিভিন্ন শহরে নিয়মিত কনস্যুলার ক্যাম্প পরিচালনা ছাড়াও ওই সব শহরে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোও পালন করা হচ্ছে।

রাজধানী ব্রাসিলিয়ার বাইরে ব্রাজিলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য নগরী সাও পাওলোতে মহান ভাষাশহীদ দিবস পালন, প্যারাগুয়ের সিউদাদ দেল এস্তে শহরে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন, বলিভিয়ার সান্তা ক্রুজ দে লা সিয়েরা শহরে এবারের মহান বিজয় দিবস উদ্‌যাপন দূতাবাসের এ প্রয়াসেরই অংশ। পরবর্তী সময়ে চিলিতেও এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দূতাবাসের এই উদ্যোগে সাড়া দিয়ে বলিভিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিরা দলমত-নির্বিশেষে গত সোমবার (১৬ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় দেশটির সান্তা ক্রুজ দে লা সিয়েরা শহরের এক সম্মেলন ভবনে মিলিত হন। এর আগে একই ভবনে দিনব্যাপী কনস্যুলার ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়। ক্যাম্প চলাকালে ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. জুলফিকার রহমান কিছু সময় উপস্থিত ছিলেন।

কনস্যুলার সেবা প্রবাসীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেবাগ্রহণকারীরা ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসকে কৃতজ্ঞতা জানান এবং এ সেবা ভবিষ্যতেও চালু রাখার দাবি জানান।

এ সময় ক্যাম্পে উপস্থিত রাষ্ট্রদূত মো. জুলফিকার রহমান তাঁদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ এবং এখন থেকে নিয়মিত বলিভিয়ায় কনস্যুলার ক্যাম্প পাঠানো হবে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রবাসীবান্ধব সরকারের সময়ে দূতাবাস বলিভিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি অতীতের অবহেলার পরিবর্তে সক্রিয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ধারা ভবিষ্যতে আরও জোরদার হবে।

সন্ধ্যায় দূতাবাস, বলিভিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি আর তাঁদের বলিভিয়ান বন্ধুদের সম্মিলিত প্রয়াসে অনুষ্ঠিত হয় দেশটিতে সরকারিভাবে প্রথম বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান। দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজিয়ে এই অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পড়ে শোনানো হয়।

মুক্ত আলোচনায় বলিভিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিরা মাতৃভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও কীভাবে দেশের মঙ্গলের জন্য যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছেন, দুর্যোগের সময় স্বদেশের মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন বা রেমিট্যান্স–যোদ্ধা হিসেবে কীভাবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে যাচ্ছেন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা রূপায়ণে সবাই একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

দূতাবাসের এ উদ্যোগের জন্য প্রবাসীরা রাষ্ট্রদূতকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ব্রাসিলিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে নবপ্রতিষ্ঠিত এ সম্পর্কের যাতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতা কামনা করেন।

রাষ্ট্রদূত মো. জুলফিকার রহমান তাঁর সমাপনী বক্তব্যে জাতির জনকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ, দুই লাখ নির্যাতিত নারী ও চার জাতীয় নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তিনি সমবেত বলিভিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন।

দূতাবাসের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রথমবার আয়োজিত এ অনুষ্ঠান সফল করে তোলার জন্য তিনি সর্বস্তরের বলিভিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে এ ধারা ভবিষ্যতেও বজায় রাখা হবে বলে রাষ্ট্রদূত বলিভিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিশ্রুতি দেন।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বেশ কিছু যুবক, যাঁদের জন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে, তাঁদের উদ্দেশে রাষ্ট্রদূত জুলফিকার বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের ঘটনাক্রম সংক্ষেপে বর্ণনা করেন। ভাষাসংগ্রামের মাধ্যমে সূচিত হওয়া স্বাধিকার আন্দোলন, বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কীভাবে পর্যায়ক্রমে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছিল, সাবলীল ভঙ্গিমায় রাষ্ট্রদূত সেসব রক্তঝরা দিনের বর্ণনা দেন।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে জাতির জনকের নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্রে জাতির জনকের শাহাদতবরণ ও তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কীভাবে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করেন। একটি উন্নয়নশীল, মর্যাদাবান ও প্রগতিশীল জাতি গঠনে দলমত-নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য তিনি উপস্থিত সবাইকে আহ্বান জানান।

বলিভিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়মিত কনস্যুলার সেবা দেওয়ার ব্যাপারেও তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত এবং এ ব্যাপারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতা কামনা করেন। ব্রাসিলিয়া থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে একটি সফল আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

বলিভিয়ায় বিজয় দিবসের এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় বাংলাদেশের দেশাত্মবোধক গান ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল’-এর কথা আর সুরে নৃত্য পরিবেশনা। জমজমাট এ সাংস্কৃতিক পর্বে একঝাঁক শিল্পীর উপস্থাপনায় বাংলা ও বলিভিয়ান সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকদের মুগ্ধ করে। বিজ্ঞপ্তি