চোখ জুড়ানো সাদা পাথরের দেশ ; ভোলাগঞ্জ – সিলেট

0
232

সিলেট – মৌলভীবাজার – হবিগঞ্জ- শৃমংগল ঘুরে এবার র ওনা দিলাম ভোলাগঞ্জের পথে যেখানে সাদা পাথরের দেখা পেলাম । তবে বেশীদিন হয়নি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের গল্প শুনেছি , দেশের সর্ববৃহৎ পাথর ভান্ডার এর অবস্থান এখানেই । প্রথম জেনেছিলাম রাস্তা বেশ খারাপ কিন্তু  আমরা  চারজন একটি ছোট গাড়িতেই মাত্র ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে যাই সিলেট শহর থেকে । মেঘালয় পাহাড় ঘেরানো এ এক এমন অভূতপূর্ব জায়গা যেটা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না – হুম ,এ আমাদের বাংলাদেশ ।

সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ৩৩ কিলোমিটার ।সীমান্তবর্তী ইস্ট খাসিয়া হিলস এর থারিয়া আর কুমোড়া হয়ে ভারতের মেঘালয় প্রদেশের রাজধানী শিলং-এ এক সময় লোকজন এই রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করতো । কালের পরিক্রমায় এখানে তৈরি হয়েছে রজ্জুপথ ,নাম ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে- এখান থেকে এই পথে পাথর নিয়ে যাওয়া হতো ছাতক পর্যন্ত । সেখান থেকে সারা দেশের রেল লাইন এর জন্য পরিবহন করা হতো। ভারতের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা ধলাই নদীর সাথে প্রতিবছর বর্ষাকালে নেমে আসে প্রচুর পাথর। ধলাই নদীর তলদেশেও রয়েছে পাথরের বিপুল মজুদ। এই পাথর দিয়ে পঞ্চাশ বছর চালানো যাবে- এই হিসাব ধরে ১৯৬৪-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে প্রকল্প। খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে ডোবাই নদী ধলাই নামে বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পয়েন্টের চারপাশ ঘুরে আবার একীভূত হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদরের কাছে ধলাই নদী মিলিত হয়েছে পিয়াইন নদীর ।  আর এই সৌন্দর্য্যের কারণেই স্থানটি পর্যটকদের কাছে এতো আকর্ষণীয় ।

দু’পাশে বিস্তীর্ণ জলাশয় আর তার মাঝ দিয়ে আমরা ছুটে চলেছি ,চোখের সামনে ভেসে উঠছে মেঘালয় পাহাড়ের বিশাল সমাহার । একটু পরপর ভেসে আসছে রূপসী নৌযান। তাদের যাত্রা পথের রেখে যাওয়া ঢেউ যেন সমুদ্রের বোন। হঠাৎ ভয় আর রোমাঞ্চ তৈরীতে তাদের তুলনা শুধুই সৈকতের বেলাভূমি । চিকচিক রূপালী রোদে মাছ ধরার নৌকাগুলো এক একটা ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে দেখতে দেখতে পৌছে যাওয়া প্রাচীন এই স্রোতধারার কাছে। যার পাথরের মাঠ শুধু সাদা নয় ঢেউয়ের ফেনাও ।

দূর থেকে মনে হচ্ছে , একে অন্যের কাঁথে হাত রেখে প্রতীক্ষা করছে পাহাড় গুলো ।নৌকা থেকেই দেখা যায় পাহাড়ের চূড়ায় চেরাপুঞ্জি শহরের একাংশ। ওখান থেকে বৃষ্টির পানি এসে এই নদীতেই আছড়ে পড়ছে । বর্ষা শেষে ভাদ্র মাস শুরু হয়ে গেছে ; দূর থেকে কাশফুল জানান দিল সে কথা । এখানে বোঝাই যাচ্ছে না কোভিড ১৯ কোনভাবে কাওকে আক্রমণ করেছে ,সবাই মাস্কবিহীন নিজের কাজে ব্যস্ত । পাথর তোলা থেকে মাছ ধরা অব্দি এমন কঠিন কঠিন শ্রমের সাথে যে জনপদের জীবন- সেখানে আলাদা করে ভাইরাস নিয়ে ভাব্বার ফুরসৎ কারো নেই এখানে ,সবে মাত্র পাহাড়ী ঢল আর বন্যার জল নেমেছে ; চাষাবাদে মন এখন কৃষকের ।

গাড়ি পার্কিং করবার আগে ড্রাইভার চারপাশ দেখে নিল ; লোকালয় থেকে কিছুটা দূরেই নামলাম । এবার মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড় আলোকচিত্রী পাভেল আল মামুনের ক্যামেরায় বন্দি করা গেল খুব সহজে । সিলেট শহর আমাদের পরিচিত নয় ,তাই যথারীতি গাইড ছিল সাথে ।সেই নিয়ে গেল ইঞ্জিন নৌকো ভাড়া করতে ; নদী পার হতে হবে । তিন জনের জন্য ৮০০ টাকা নেবে সাদা পাথরে যেতে আর ফিরতে ,বেশি লোক হলে কম পয়সায় যাওয়া যায় ,কিন্তু এই অসময়ে আমি ভিড় এড়াতে চাচ্ছি । আমার চোখে মুখে জগতের বিস্ময় ! ব-দ্বীপ আকৃতির মধ্য দিয়ে নৌকা ছুটে চলেছে ,সেই সাথে চলছে পাভেল আল মামুনের ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক ,। মন চাইলো এতো সুন্দর জলে একটু পা ডুবিয়ে থাকতে কিন্তু ১৫ মিনিটের পথ খুব দ্রুত ফুরিয়ে গেল । নামার পর অনেক খানি রাস্তা শুধু মাটি তারপর শুরু হলো বিস্ময়কর সাদা পাথর-এর মাঠ । প্রথমে বোঝা যায় না ; কিন্তু পা দিতেই যেন আমি পড়ে যাচ্ছিলাম । অবশেষে দু’পা’য়ের চপ্পল হাতে নিয়ে বীর দর্পে পার হলাম পাথর স্তূপ । ইনানী বীচের পাথর এই পাথরের কাছে হার মেনে গেল ; এও পিচ্ছিল যে পা-ই রাখা যায় না ! গাইড সাবধান করে দিল- পানির নীচের পাথর দেখে পিচ্ছিল বোঝা যায় না তাই মাঝে মাঝেই দূর্ঘটনা ঘটে।

আমরা কিন্তু এখন অবস্থান করছি জিরোপয়েন্টে ,লাঠি দিয়ে সেটা ভাগ করা আছে ,পানির মধ্যেই ওপাশে ভারত আর এই পাশে বাংলাদেশ , কী এক রোমাঞ্চকর ব্যাপার ! এখানে রয়েছে একটি ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন। এ স্টেশন দিয়ে আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম চলে। এ স্টেশন দিয়ে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা প্রধানত চুনাপাথর আমদানী করে থাকেন। চুনাপাথর নিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পরপর পাথর ভাঙ্গার শব্দে আপনি চমকে উঠবেন , এই বুঝি কেও গুলি করে দিল । সীমান্তে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবার সময় আমার এমনি অনুভূতি হয় প্রায়শই । কিছুক্ষন পরপরই বিস্ফোরনের শব্দ আর আলোর ঝলাকানি আসে ভারতের পাথরখনি থেকে , ওপারের সব পাহাড়গুলোই চুনাপাথরে ভর্তি।

কেও যদি এখানে থাকতে চান তাহলে জেলা পরিষদের একটি রেস্ট হাউস আছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তত্তবধানে। থাকতে হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুমতি নিতে হবে । এ ছাড়া ভোলাগঞ্জ বা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় থাকার জন্য তেমন কোন ভালো ব্যবস্থা নাই। আপনি ভোলাগঞ্জ দেখা শেষ করে সিলেটে এসে অবস্থান করলেই সুবিধা । কারণ পরদিন যদি ছুটি থাকে তাহলে রাতারগুল / বিছানাকান্দি চলে যেতে পারেন আর ছুটি না থাকলে যার যার কর্মক্ষেত্রে । অথবা যদি খুব সকালে শুরু করতে পারেন তাহলে মোটর সাইকেল অথবা বর্ষাকালে নৌকায় বাড়তি পেতে পারেন উৎমাছড়া আর বিছানাকান্দি দেখার সুযোগ । তার জন্য অবশ্য গাইডের বিকল্প নেই , একটু খুঁজলেই বাইক সমেৎ গাইড মিলে যায়।

করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ ছ’মাস পর্যটন শিল্প স্থবির ছিল । কিন্তু এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে হোটেল রেস্তোরাঁ খুলে দিয়েছে সরকার তাই ভ্রমণ পিপাসুদের অনুরোধ করছি যারা ঘোরাঘুরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা অবশ্যই ভিড় এলাকা এড়িয়ে চলবেন , মাস্ক ব্যবহার করবেন এবং অবশ্যই প্লাস্টিকের সামগ্রি যত্রতত্র না ফেলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবেন  । আমি সারা পথ প্লাস্টিকের বোতল হাতে রেখে ঢাকায় এসে ডাস্টবিনে ফেলেছি , সবাই যদি নিজের জায়গা থেকে সচেতন হই তাহলে আমাদের দেশ আরো সুন্দর থাকবে এবং করোনা পরিস্থিতি ঠিক হয়ে গেলে অনেক বিদেশী পর্যটক বাংলাদেশে এসে স্বস্তি পাবে । নিরাপদ ভ্রমণ হোক আপনার আমার সবার নাগরিক অধিকার ।

রোদেলা নীলা

নির্বাহী সম্পাদক

দ্যা ট্যুরিজম ভয়েজ

monory01@gmail.com