বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আবিস্কার: ‘ব্র্যান্ড নাম’ ও ‘আইকনিক ল্যান্ডমার্ক’ || মোখলেছুর রহমান ||

0
181

প্রসঙ্গকথা:
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে বিশ্বজুড়ে উপস্থাপনের জন্য জনসাধারণের নিকট থেকে নতুন ‘ব্র্যান্ড নাম’ ও ‘আইকনিক ল্যান্ডমার্ক’ জমা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে তাদের ওয়েবসাইটে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে। জমা দিতে হবে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০-এর মধ্যে, যার জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় পুরস্কার (Exciting Prize)। তাদের উদ্দেশ্য হলো পুরাতন ‘ব্র্যান্ড নাম’ বাতিল করে এবং ‘আইকনিক ল্যান্ডমার্ক’ যুক্ত করে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে বিশ্বজুড়ে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা। সিদ্ধান্তগুলি ভালো; এর জন্য আমরা স্বাগত জানাই। তবে বিটিবির এই পদক্ষেপে ২টি বড় জিজ্ঞাসা আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়।

প্রথমত, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিং করবে বলে বেশ ঘটা করে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয় এবং পর্যটন ব্যবসায়ীদেরকে নিয়ে কয়েক দফা মিটিং করে। এরপর তা হঠাৎ কোন অজানা কারণে থেমে যায় এবং আগের সকল কিছু বাদ দিয়ে রাতারাতি একটি ৫ তারকা হোটেলে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ নামে একটি ট্যাগলাইন ঘোষণা করে। এই ঘটনায় সকলেই এতোটা হতটকিত হয়ে পড়ে যে, সকল পর্যটন ব্যবসায়ীরা এই অনুষ্ঠান বয়কট করে। পরে জেনেছি যে, এটা ৭৫ লক্ষ টাকার খেলা ছিলো তাই বিলম্ব করা সম্ভব হয় নাই। অতি গোপনীয় এটি আবিস্কারের জন্য কোন ইন্ডাস্ট্রি প্লেয়ার এটি ব্যবহার করে না এবং সরকারের পক্ষ থেকেও এটি ব্যবহারের কোন তাগিদ পরিলক্ষিত হয় নাই। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবার একটু ভিন্ন কায়দায় এবং পূর্ববৎ তুগলকি ফর্মুলায় ‘ব্র্যান্ড নাম’ আবিস্কার করতে যাচ্ছে। পুরস্কার ঘোষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘ব্র্যান্ড নাম’ আমাদের জন্য ঠিক কী সুফল বয়ে আনবে-তা অজানা। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কাছেও এর উত্তর আছে কি না, জানা নাই। সারা পৃথিবীর ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিংয়ের গুরু বলে খ্যাত ব্রিটিশ নাগরিক সায়মন এনহল্ট গ্যারান্টি দিয়ে ‘ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিং’ নিয়ে কাজ করেন। তাই ট্যুরিজম বোর্ড এই দায়িত্ব নিলে তাকেও তার কাজের জন্য গ্যারান্টি দিতে হবে এবং দায় নিতে হবে। উল্লেখ্য যে, জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দিয়ে ২০০৯ সালে ‘হ্যান্ডবুক অন ট্যুরিজম ডেসটিনেশন’ বইটি প্রকাশ করেছে। যেখানে তারা ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিংকে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবে হয়, তার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। আমাদের চোখের সামনে এই পরিস্কার গাইডলাইনটি উপেক্ষা করে বিজ্ঞাপন দিয়ে কীভাবে ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিং করা যায়, তা আমাদের কারুরই জানা নাই।

দ্বিতীয়ত, ২০১৪-২০১৫ সালে ‘আইকনিক ল্যান্ডমার্ক’ নিয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এক বিরাট আয়োজন করে এবং তাতেও কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করে পরে তারা কোন এক অজানা কারণে পিছু হটে। ঐ সময় পর্যটন আইকন নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড জাতীয় একাধিক দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে একটি জাতীয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এই প্রতিযোগিতায় প্রাপ্ত প্রস্তাবনাগুলি থেকে প্রাথমিকভাবে ৩টি আইকনকে (জাতীয় স্মৃতি সৌধ, জাতীয় শহিদ মিনার ও সংসদ ভবন) বেছে বের করে। অতপর তা অনুমোদনের জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু এরূপ অনুমোদনের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের না থাকায় পরে আর তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে প্রেরণ করা হয় নাই। তাই তা থেমে যায়। এখন বিটিবি একইভাবে আবার একই কাজ করতে যাচ্ছে। যদি আগের ঘটনা ঠিক হয়, তাহলে তারা আগেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন কি না তা জানা দরকার। বোধ করি বিষয়টির অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী যখন যা খুশি করবে, আবার বাতিল করে দিবে এটা অনাকাঙ্খিত। প্রজাতন্ত্রের উর্ধতন কর্মচারি হিসেবে বিটিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক প্রজাতন্ত্রের সম্পদ রক্ষার পরিবর্তে এরূপে তছরুপ কেনভাবেই কাম্য নয়।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ‘ব্র্যান্ড নাম’ বলতে কী বুঝাতে চেয়েছে, বিজ্ঞাপন থেকে তা পরিস্কার হয় নাই। তবে জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (UNWTO) বলছে যে, ডেসটিনেশন ব্র্যান্ড একটি প্রতিযোগিতামূলক স্বত্ত্বা, যা একটি গন্তব্যকে অন্য গন্তব্য থেকে আলাদা করতে সাহায্য করে। ব্র্যান্ড গন্তব্যের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলির নির্ধারক, যা অন্য প্রতিযোগীদের কাছ থেকে গুণগতভাবে ভিন্ন বলে পরিচিত করে। তাই ব্র্যান্ড শুধু একটি লোগো কিংবা আইকন নয়; একটি অভিজ্ঞতা ও ইমেজ যা গন্তব্যের মূল্য ও অবস্থান নির্ণয়ের নির্দেশক। ব্র্যান্ড কোন গন্তব্যের মৌলিক গঠন কাঠামোর একক, যাতে মার্কেটিং ও আচরণের সকল বৈশিষ্ট্যাবলি সুপ্ত থাকে।

বিটিবি-র ‘ব্র্যান্ড নাম’ বনাম UNWTO-র ‘ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিং’:

অর্থাৎ, ব্র্যান্ড মিশ্রণ = প্রতিজ্ঞা + মূল্যবোধ + স্বত্ত্বা

উপরের সমীকরণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ডেসটিনেশন ব্র্যান্ড হলো একটি গন্তব্যের মূল্যবোধ, প্রতিজ্ঞা ও স্বত্ত্বার মিশ্রণ যা উক্ত গন্তব্যের পর্যটন পণ্যের বৈশিষ্টাবলি ও মূল্যবোধের সমন্বিত দৃশ্যমান ও অদৃশ্য অবয়বকে প্রকাশ করে। এই বৈশিষ্ট্যাবলি সাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে এবং পর্যটকরা গন্তব্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সুতরাং, ব্র্যান্ডিং একটি প্রতিজ্ঞা যার মাধ্যমে একটি গন্তব্য পর্যটকদের কাছে চাহিদা পূরণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে।

ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডের সাথে কী কী উপাদান কতটুকু পরিমাণে সম্পৃক্ত এ বিষয়ে জাতিসঙ্ঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা তাদের প্রকাশিত হ্যান্ডবুকে বিস্তারিত উল্লেখ্য করেছে। নিচে এসব উপাদান উল্লেখ করা হল:

ক) মূল্যবোধ (Values) – ১৮%
খ) প্রতিযোগিতামূলক স্বত্ত্বা – ১৭%
গ) গন্তব্যের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য – ১৭%
ঘ) লোগো – ৯%
ঙ) প্রডাক্ট – ৭%
চ) ডিজাইন স্টাইল – ৭%
ছ) টোন বা রঙের প্রভাব – ৬%
জ) বাজারজাতকরণ প্রচারাভিযান – ৬%

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, অনেকে কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং বা প্লেস ব্র্যান্ডিংকে ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিংয়ের সমার্থক বলে মনে করেন, যা মোটেও ঠিক নয়। ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিং ও কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের মধ্যে বেশ কিছু গুণগত পার্থক রয়েছে, নিচে সে সব উল্লেখ করা হল:

ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিং: এই ব্র্যান্ডিং পর্যটন গন্তব্য বা অনুগন্তব্যের সাথে সম্পৃক্ত। পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি ডেসটিনেশন ম্যানেজমেন্ট সংগঠনগুলি এই ব্র্যান্ডিং নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে।

কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং: এই ব্র্যান্ডিং দেশের সাথে সম্পৃক্ত। ইমিগ্রেন্ট ও বিনিয়োগকারীদেরকে আকর্ষণ করার জন্য করা হয়। শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা সমূহ এই ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করে।

ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিংয়ের উপকারিতা:

ক) সচেতনতা বৃদ্ধি ও চাহিদা সৃষ্টি: কোন দৃষ্টি আকর্ষণকারী গন্তব্যের ব্র্যান্ডিং সম্পর্কে অবগত হন, তার মধ্যে চাহিদা সৃষ্টি হয় এবং তিনি পর্যটন ক্রয়তালিকায় উক্ত গন্তব্যকে অন্তর্ভূক্ত করেন। মিডিয়া ব্র্যান্ড প্রচারণা কার্যক্রম চালানোর প্রেক্ষিতে গন্তব্য সেলিব্রেটির মূল্য লাভ করতে পারে।

খ) গ্রাহকের আনুগত্য: গন্তব্যের সাথে গ্রাহকের অনুগত সম্পর্ক তৈরি করা ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিংয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে গ্রাহকেরা গন্তব্যের মূল্যবোধ, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সম্পদ, আবেগজনিত সুফল ইত্যাদির সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন যে, পরবর্তীতে তারা নিজেরাই উক্ত গন্তব্যের দূত হিসেবে প্রচারণা শুরু করেন।

গ) বাণিজ্যিক মূল্য: কোন ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিং একবার গ্রহণযোগ্য স্থায়ীত্ব লাভ করলে তা অত্যন্ত শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে পর্যটকদের ভ্রমণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। তাই ব্র্যান্ডিং গন্তব্যের প্রতি অনুগত পর্যটকদেরকে ধরে রেখে একটি গ্রাহক পুল গড়ে উঠে। ফলে উক্ত গন্তব্য তার বাজারজাতকরণ ব্যয় ও সময় বাঁচিয়ে কৌশলগত বিক্রয়ে সফলতা লাভ করতে পারে।

ঘ) বেসরকারি খাতের প্রচেষ্টার ভিত্তি: বহুল আলোচিত এবং দূর দৃষ্টিসম্পন্ন ব্র্যান্ডিং পর্যটনের সকল স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের পণ্য উন্নয়ন ও বাজারজাতকরণে মৌলিক উপাদান হিসেবে ব্র্যান্ড ব্যবহার করেন।

ঙ) ইমেজ বৃদ্ধি: ব্র্যান্ড ‘সিল অফ অরিজিন’ হিসেবে গন্তব্যের ভাবমূর্তি প্রচার করে। যা ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড উভয় গন্তব্যের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।

ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিংয়ের সফলতার কারণ:

গন্তব্য ব্র্যান্ডিংকে সফল করতে হলে এর স্বকীয় চরিত্র বজায় রেখে সেবা প্রতিশ্রুতি অক্ষুন্ন রাখতে হবে। গন্তব্যের সফলতা নির্ভর করে ব্র্যান্ডিংয়ে নিচের উপাদানগুলোর মধ্যে কত বেশি সংখ্যক নিয়ামক সম্পৃক্ত।

ক) ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতা: একটি ব্র্যান্ড যখন নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের বিষয়ের উপর গ্রাহকের কাছে প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, তখন আপনা থেকেই গ্রাহকের মধ্যে প্রাসঙ্গিক চাহিদা তৈরি হয়। এমতাবস্থায়, প্রতিশ্রুতি মোতাবেক চাহিদা পূরণ করতে পারলে উক্ত ডেসটিনেশন ব্র্যান্ড গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
খ) সেবাদান নিশ্চয়তা: গন্তব্য ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রতিশ্রুতির চেয়ে কম সেবা প্রদান করা যাবে না। ব্র্যান্ড ডিজাইন পরীক্ষান্তে এই মর্মে এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা প্রদান সঠিক হচ্ছে।
গ) স্বকীয়তা: প্রতিযোগী অন্য যে কোন গন্তব্য থেকে পর্যটকরা যেন সহজেই আলাদা করতে পারে, এই নির্দেশকগুলি পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে হবে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক স্বকীয়তা ব্র্যান্ডিং সফলতার অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
ঘ) শক্তিশালী ধারণা উপস্থাপন: শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং গ্রাহককে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবান্বিত করে। তাই গন্তব্য ব্র্যান্ডিংকে সফল করতে হলে এর ধারণা ও মূল্যবোধ বাজারে শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
ঙ) বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের নিশ্চয়তা: পরিপূর্ণ ফল লাভের উদ্দেশ্যে কেবল ডেসটিনেশন ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলি এককভাবে ব্র্যান্ড পজিশন প্রচার করতে পারবে না। তাই সরকারি নেতৃত্বাধীন থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পর্যটনের সকল চালকদেরকে (Drivers of Tourism) যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কেননা, একটি জয়ী ডেসটিনেশন ব্র্যান্ড সৃষ্টি করা সম্ভব হলে সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে পারবে।

বিটিবি-র আইকনিক ল্যান্ডমার্ক:
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড যাকে আইকনিক ল্যান্ডমার্ক বলে উল্লেখ করেছে, সারা পৃথিবীতে তা ‘পর্যটন আইকন’ বলে পরিচিত। তাই বিজ্ঞাপনের এই নতুন ভাষায় কেউ কেউ গোলক ধাঁধায় পড়েছেন। পর্যটন আইকন হলো একটি গন্তব্যের প্রধান উপাদান, যা সম্ভাব্য পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পর্যটকদেরকে গন্তব্যে টেনে আনতে পর্যটন আইকনগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটকদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য পর্যটন আইকন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পর্যটকরা ঐ গন্তব্য পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন এবং আসেন এক অনুপম অভিজ্ঞতা অর্জন করতে। তাই বিশ^জুড়ে পর্যটন আইকনকে অন্যতম প্রমোশন সহায়ক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ছোট্ট বিষয়টি বিটিবি বিজ্ঞাপনে পরিস্কার করলে সাধারণের পক্ষে মত দিতে সুবিধা হতো।

উপসংহার:
আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, পর্যটনকে এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করার জন্য বিটিবি গত ১০ বছরে কোন পদক্ষেপ দিলো না। অথচ ‘পর্যটন শিল্প’কে তারা বিশ্বজুড়ে উপস্থাপনের জন্য অতিব্যস্ত। এটাই আমাদের পর্যটনের দূর্ভাগ্য। পর্যটন অনিবার্য অবহেলা ও বিনষ্টির শিকার। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেটে পর্যটনের জন্য অদ্যাবধি কোন খাত তৈরি করা হয় নাই। ফলে এর জন্য কোন বাজেটও চাওয়া হয় না। মন্ত্রণালয় কর্তৃক অদ্যাবধি পর্যটনের উপখাতগুলি নির্ধারণ না করায় বাংলাদেশ ব্যাংক ‘পর্যটন ঋণদান নীতিমালা’ তৈরি করতে পারছে না। এখনো ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্টিং সিস্টেম চালু না করার জন্য তথ্যের জন্য নির্ভর করতে ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের উপর। আমরা এখনো জানি না পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা ও পরিবেশের উপর কী প্রভাব বিস্তার করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ট্যুরিজমের নামে ট্যুরিজম বহির্ভূত বিষয়গুলি পড়ানো হচ্ছে। অযুহাত হিসেবে বলা হচ্ছে যে, এটি ইন্টারডিসিপ্লিনারি সাবজেক্ট। পর্যটনের উন্নয়নের নামে যথেচ্ছাচার, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অযত্ন, অবহেলা এবং সাথে চলছে লুটপাট। এর একমাত্র প্রতিকার হতে পারে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব প্রদান এবং তরুণদেরকে সংগঠিত করে কাজ করা। বুঝে সুঝে ডেসটিনেশন ব্র্যান্ডিং ও পর্যটন আইকন মনোনয়ন অত্যন্ত দরকারি। কোন আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে করা হলে তা অতীতে পর্যটনের যে ক্ষতি হয়েছে, ভবিষ্যতেও তাই করবে। কারণ পৃথিবীর পর্যটন যখন তীরবেগে এগোচ্ছে, তখন আমাদের এই দূর্দশা আত্মঘাতি পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে। আমলাতন্ত্রের বেড়াজালে পড়ে এর আরেক দফা মৃত্যু সম্ভবত তা কেউ ঠেকাতে পারবে না।