পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা রিমা

0
215

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন সমাজ সেবক, সংগঠক, রন্ধন শিল্পী, পর্যটন প্রশিক্ষক, গবেষক এবং পর্যটন উদ্যোক্তা রিমা জুলফিকার  এর পথচলার গল্প।

এক বিংশ শতাব্দীতে উন্নত বিশ্বের মাথা উচু করে দাড়ানোর প্রধান হাতিয়ার হল শক্তিশালী অর্থ নৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমান সম্পদ এবং জনশক্তি রয়েছে কিন্তু প্রায় অর্ধেত জন গোষ্ঠী নারী, এই নারীদের সক্রিয় ভূমিকা না থাকায় তাদের অনেকাংশ পিছিয়ে পড়ে থাকা। কিন্তু একটা দেশের অর্থ নৈতিক অবস্থা মজবুত করার জন্য প্রয়োজন পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশ গ্রহণ। এই প্রয়োগের দ্ধার উম্মুক্ত করার জন্যই রিমা জুলফিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন গৃহসুখন, যার উদ্দেশ্য বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্যোগী ও সৃজনশীল নারী সুবিধা বঞ্চিত, অসহায় দুস্থ এবং কর্মঠ মহিলাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষনের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা, কারণ রিমা জুলফিকার বিশ্বাস করেন নারী হাতকে কর্মীর হাতে পরিনত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।

রিমা জুলফিকার ১৯৬৩ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার দক্ষিণ কোটগাও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার আলম হোসেন, মা জরিনা হোসেন, ৬ বোন, ৪ ভাইয়ের বেশ বড় পরিবার। রিমা বোনদের মধ্যে ছোট। স্বামী প্রকৌশলী মোঃ মুঈন উদ্দীন জুলফিকার । ২ ছেলে ১ মেয়ে- রাজিত, রিজাত ও জুরী। ১৯৭৯ সালে মুন্সিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় এসএসসি পাস করেন এবং ১৯৮১ সালে মুন্সিগঞ্জ সরকারী হরগঙ্গা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।পরবর্তীতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এবং এমবিএ করেন। দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটন ও ফুড অ্যান্ড  বেভারেজ এর উপর প্রশিক্ষণ সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিজনেস ম্যানেজমেন্টের উপর ডিপ্লোমা করেন। ১৯৯০ সালে ১০০টির অধিক বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘গৃহ সুখন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যার স্লোগান হল- “প্রশিক্ষণ নিন আয় করুণ”। প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ যোগ্য বিষয় হল- বিভিন্ন প্রকার রান্না, ফুড প্রোসেসিং, হস্তশিল্প, ড্রেস মেকিং, ট্রেইলারিং, ফ্যাশন ডিজাইন, বিউটিফিকেশনসহ ১০০টির অধিক বিষয়।

রিমা নারী উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে রান্না, হস্তশিল্প ও বিউটিফিকেশনের উপর দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও বিভিন্ন প্রোগ্রাম করে আসছেন। রাঁধুনি রান্না প্রতিযোগিতা, রূপচাঁদা সেরা রন্ধনশিল্পী প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ‘নেসলে ঝটপট রান্না’, ‘রাঁধুনি রান্না এখন খেলা’, ‘ডিপ্লোমা গুঁড়ো দুধ মিষ্টি লড়াই’য়ের সাথে কাজ করেন। World Vision মহিলা বিষয়ক  অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন- এর Swiss Contact- এর Skillful প্রজেক্ট ধানমন্ডি, কামরাঙ্গীর চর ও রায়ের বাজারে ট্রেনিংয়ের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়াও তিনি অসহায়, দুস্থদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করেন। রিমা শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ২০০৪ সালে DCCI থেকে পুরস্কার পান। তিনি ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কনফারেন্সে ট্রেনিং ও বাংলাদেশী ট্র্যাডিশনাল পণ্য নিয়ে মেলা ও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করেন। বর্তমানে Women Training Institute for Empower Women in Bangladesh- এর উপর কাজ করেছেন।

গৃহ কর্মের কাজ শেষ করে অবসর সময়টুকু কাজে লাগিয়ে শৈল্পিক চর্চায়, তার শৈল্পিক কর্মে তিনি পরিবার এবং প্রতিবেশীদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠলেন এবং সেই উৎসাহকে  পুঁজি করে মাত্র ১২জন প্রশিক্ষণার্থী ও ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ১৯৯০ সালে শুরু করেন স্বপ্ন বাস্তবায়নের রণযাত্রা। নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হলেও ফিরে তাকাতে হয়নি রিমা জুলফিকারকে। কারণ স্বামীর সম্পূর্ণ সহযোগিতায় স্বপ্নের হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছেন স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে। গ্রীন রোডে, গ্রীন স্কয়ারে ব্যাপকভাবে শুরু করেন ‘গৃহ সুখনের’ কর্মকাণ্ড, আর এভাবেই ধীরে ধীরে জাতীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখা শুরু হয় রিমা জুলফিকারের।

রিমা জুলফিকারের প্রমাণ করেন একজন দক্ষ উদ্যোক্তার মাধ্যমেই হাজার হাজার যোগ্য উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব। এটাকেই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাফল্য হিসেবে তিনি মনে করেই সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন সম্মাননা স্মারক, স্বাধীনতা সংসদ থেকে বিশিষ্ট মহিলা উদ্যোক্তা পদক লাভ করেন ২০০৩ সালে। বাংলাদেশ ইউথ বিজনেস ফোরাম থেকে ২০০৪ সালে অর্জন করেন- বিশিষ্ট মহিলা স্বর্ণ পদক, স্বাধীনতা সংসদ আয়োজিত শহীদ জিয়া স্মৃতি পুরস্কার ও ঢাকা গোল্ড মেডেল ২০০৪, D.C.C.I এবং সাইফ এর যৌথ আয়োজনে শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা পদক ২০০৪, F.B.C.C.I শ্রেষ্ঠ স্টল ও শ্রেষ্ঠ পণ্য এওয়ার্ড, জসীম উদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার, মীর মোশারফ হোসেন স্মৃতি পুরস্কার ২০০৫, ২০০৬ সালে কালচারাল রিপোর্টস এসোসিয়েশন থেকে SME মেলায় শ্রেষ্ঠ স্টল, ২০০৭ সালে বেগম রোকেয়া শাইনিং পারসোনালিটি ও দেশের কাগজ বিজনেস এওয়ার্ড, ২০০৮ সালে উইমেন পারসোনালিটি এওয়ার্ড। আন্তর্জাতিক মৈত্রী সম্মাননা ২০১৯ শ্রেষ্ট নারী উদ্যোক্তা, কোলকাতা। বারিসাস এ্যাওয়াড-২০১৭-২০১৮

যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ঃ
অসংখ্য নারীর নিত্য আনাগোনা এখন গৃহ সুখনে, সময়ের সমস্ত দাবী মিটিয়ে এগিয়ে চলেছে নিজস্ব গতিতে, নিজস্ব পরিচয়ে। প্রয়োজনের তাগিদে বেড়েছে গৃহ সুখনের কর্ম পরিসর। ৯টি সেকশনে ১০০টির অধিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। রান্না, হস্তশিল্প, বিউটিফিকেশন, ফ্যাশন ডিজাইন, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট এন্ড কাউন্সিলিং, স্পোকেন ইংলিশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। শুধু কি প্রশিক্ষণ দিয়েই তিনি শেষ করেছেন তার দায়িত্ব? এই প্রশ্নের উত্তরে উঠে এসেছে গৃহ সুখনের কার্যাবলীর তালিকা। প্রথমেই উঠে আসে গৃহ সুখন মহিলা সমিতি।

গৃহ সুখন মহিলা সমিতিঃ
নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন পুঁজির। এজন্য প্রশিক্ষণার্থীদের প্রয়োজনীয় পুঁজি চতুর্মুখী সহযোগিতার জন্য ২০০২ সালে গঠন করা হয় গৃহ সুখন মহিলা সমিতি।সমিতির রেজিস্ট্রেশন নেন উইমেনস  এফেয়ার্স কর্তৃক ২০০৪ সালে এবং এনজিও এফেয়ার্স ব্যুরো কর্তৃক ২০০৬ সালে। International trade centre মাধ্যমে Implementing Food safety management systems According to ISO 22000:2005.

লক্ষ্য: দারিদ্র বিমোচন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরাবিত করার লক্ষ্যে দেশের ক্ষুদ্র মাঝারী শিল্পে উদ্দ্যোগী ও সৃজনশীল নারীদের গৃহ সুখনের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে সঠিক ও দিক নির্দেশনায় সৃজনশীল নারীদের আত্মকর্ম সংস্থানে পথ সহজতর করে দিতে পারে।

উদ্দেশ্য: উদ্দ্যোক্তা উন্নয়নে উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন পন্য উৎপাদনের প্রত্যেকে যার যার কর্মক্ষেত্র গড়ে তুলতে পারে নিজের আলাদা একটি পরিচয়। নারীরের আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি করে কাজের উপযোগী করে তোলে বেকারত্বের হার লাঘব করে নারী আতœনির্ভরশীল হবে। একজন নারী দশজনকে কাজে  লাগাতে পারবে।

গৃহ সুখন মহিলা সমিতির কর্যাবলীঃ
প্রশিক্ষণার্থীদের পুঁজি সরবরাহ, অসহায় দুস্থ মহিলাদের ফ্রি প্রশিক্ষণ প্রদান ও কাঁচামাল বিতরণ, এবং সমাজে সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছে “গৃহ সুখন মহিলা সমিতি”।

গৃহ সুখন মহিলা সমিতির সফল কাজঃ 
ক) worked with Swiss contact,skill-Full project of European union. পাঁচ বৎসর। ১৪৫০জন।সুবিধা বঞ্চিত নারীদের (১)গার্মেনট মেশিন অপারেটিং (২)ফ্যাশন ডিজাইন (৩)বিউটি ফিকেশন। (৪)ফুড প্রসেসিং (৫)খাবার বাবাজারজাত করন। (৬)মেশিন এব্রয়ডারী। (৭)মোবাইল সরভিসং সল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি ট্রেনিং এ কর্ম সংস্থান সৃষ্টি ও ফলোআপ।
খ) UNDP,Care Bangladesh, সাথে যৌথভাবে ঢাকা ও টাংগাইলে Dhaka, Tangail. পোশাক তৈরি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত  ট্রেনিং কর্ম সংস্থান সৃষ্ট করেন ১৫০০ নারীর।
গ) ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সাথে ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ফুড প্রিপারেশন ও প্রসেসিং ট্রেনিং করান ৫০০ নারীকে।
ঘ)International organizations for migration (IMO)এর সাথে ফুড প্রসেসিং কোর্স করান স্পেশাল গ্রুপ গুলোকে।
ঙ) বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন।
চ) নেস্টলে কোম্পানির কুকিং প্রশিক্ষক হিসাবে গৃহ সুখন এর চেয়ারম্যান রিমা জুলফিকার ৫ মাস দায়িত্ব পালন করেন।

দেশ বিদেশ: তিনি জ্ঞানে পরিধিকে আরও বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন মেলা ও কনফারেন্সে অংশ গ্রহন করেছেন ভ্রমন করেছেন বিভিন্ন দেশ, ২০০১ সুইজার ল্যান্ড এমাইনডেস্ট কনফারেন্স ও মেলা অংশ গ্রহন করেন। দিল্লী সম্পাদনা ৭ দিনের কনফারেন্স, অংশ গ্রহন করেন। কোলকাতা মেঘা ট্রেড ফেয়ার পরপর তিন বার অংশ গ্রহন করার সুযোগ হয়েছে, ২০০৭ সালে মালশিয়ার কুয়ালামপুরে অনুষ্টিত বিজনেস উইমেন ফোরাম এন্ড এক্স পোজিশষন এ অংশ গ্রহন করেন। আমেরিকা ফোবানা মেলা অংশ গ্রহন করে২০১১-২০১৪-২০১৬, ইটালী বৈশাখী মেলায় সেনতো চেল্লো পার্কে অংশ গ্রহন পাকিস্তানে করাচিতে এক্সপোর্ট ফেয়ার, গুহাটি ইন্টান্যাশনাল মেলা, ইংলেন্ডে ফেয়ার ফ্যাস্টিভাল। নেপাল ইনটারন্যাশনাল EPB মেলা। তা ছাড়াও গৃহসুখন মহিলা সমিতির মেয়েদের তৈরী পন্য নিয়ে লোকাল মেলা করেন। এবং গৃহসুখন নিজেই মেলার আয়োজন করেন। সমিতির সদস্যদের পন্য বিক্রি করার জন্য দীর্ঘ দিন Women Training Institute for Empower Women in Bangladesh এর উপরে কাজ করেছেন।

যে সব সংগঠনের সাথে যুক্ত রিমাঃ
১। কুকিং এ্যাসোসিয়েশন, ভাইস প্রেসিডেন্ট।
২। ডাইরেকটর, রোটারি ক্লাব, ঢাকা কাওরান বাজার।
৩। ঐক্য ফাউন্ডেশন ডাইরেকটর
৪। সী-ট্রেড বাংলাদেশ মেম্বার।
৫। বাংলাদেশ ফেডারেশন ওমেন এন্ট্রাপ্লেনারস মেম্বার।
৬। বাংলাদেশ কুটির শীল্প সমিতি মেম্বার।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ রিমা জুলফিকার  এর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে তার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। রিমার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।