পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা সুজানা

0
742

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই’কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী, হোটেল ব্যবসায়ী, প্রশিক্ষক এবং পর্যটন উদ্যোক্তা সুজানা সুমীর পথচলার গল্প।

১৯৮৯ সালে বাবার সরকারি চাকরির স্থান আশুগঞ্জ সার কারখানাতেই জন্ম সুজানা সুমীর। শৈশব কৈশোর ও বেড়ে ওঠা সেখানেই। বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ২০০৫ সালে আশুগঞ্জ সারকারখানা স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এস.এস.সি এবং ২০০৭ সালে একই প্রতিষ্ঠান এইচ.এস.সি পাস করেন। তারপর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১২ সালে ইংরেজিতে অনার্স এবং ২০১৩ সালে মাস্টার্স শেষ করেন। পড়াশোনা করা অবস্থায়ই ড্রেস ডিজাইন, তৈরি ও বিক্রয় শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ঢাকায় পড়াশোনার জন্য থাকার ব্যবস্থার অপ্রতুলতা দেখে তখন থেকেই ভাবনায় আসে কিছু করার আর সেখান থেকেই ধানমন্ডিতে ২০০৯ সালে “ক্যালিফোর্নিয়া এক্সক্লুসিভ লেডিস হোস্টেল” নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

২০১০ সালে সুজানা শুরু করেন ড্রেস এর বিজনেস। নতুন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ওখানেই সময়টা স্বাভাবিক ভাবেই বেশি দিতে হয়! বাকি সময়ে লেডিস হোস্টেলে দেন। কারণ লেডিস হোস্টেল ৩০০ স্টুডেন্ট নিয়ে গড়ে উঠেছিল মোট চারটা ৫ তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং জুড়ে। যেখানে এক্সক্লুসিভলি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন খুবই পরিপাটি ভাবে, যতটা পেরেছেন।

নিরাপত্তার সাথে এক্সক্লুসিভ পরিবেশে থাকা-খাওয়া সহ, এসি, নন-এসি রুম, ওয়েল ফার্নিশড রুম, ফ্রিজ প্রতি ফ্লোরে কমন, ওয়াইফাই পুরো বিল্ডিং জুড়ে। ক্লিনার প্রতি ফ্লোরের আলাদা ২৪ ঘণ্টা কাজ করে। ইলেক্ট্রনিক ওয়াটার ফিল্টার প্রতি ফ্লোরে, আইপিএস এর সুবিধা সহ কম_খরচে নির্ভেজাল ভাবে থাকার সব সুবিধা গুলো উপভোগ করতে পারেন সবাই। বসবাসরত অবস্থায় অসুবিধা গুলো দেখার জন্য অভিজ্ঞ মহিলা সুপার আছেন। উনারা ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস নিশ্চয়তা সহ হোস্টেলের তিন-বেলা খাবারের ব্যবস্থা করেন।

সুজানা লেডিস হোস্টেল ও ড্রেস হাউজের পাশাপাশি একটা ছোট্ট কুকিং ইন্সটিটিউট করেছেন। যেখানে প্রতিমাসে ৩টা করে বেকিং, কুকিং ও ডেজার্ট এর ওপর ক্লাস নিচ্ছেন। পাশাপাশি সেখানেই তিনি ক্যাটারিং এর কাজগুলো করার জন্য লোকবল রেডি করে রেখেছেন। যেখানে থেকে বিভিন্ন ইভেন্টের জন্য সর্বোচ্চ ২০০০ জনের খাবারের অর্ডার নিয়ে সময় মতো ডেলিভারি করতে পারেন। যেমনঃ বিয়ে, জন্মদিন, অফিসিয়াল পার্টি, ফ্যামিলি পার্টি সহ যেকোনো ইভেন্ট এর জন্য অর্ডার অনুযায়ী সরবরাহ করেন।

সুজানার শখের কাজ হল কেক তৈরি করা সপ্তাহে ৫ দিন সব ধরনের কেকের অর্ডার নেন। দৃক গ্যালারিতে নিজের তৈরি করা কেক নিয়ে দুইদিন ব্যাপী এক্সিবিশন করেন। ২০১৮ সালে পাশাপাশি ড্রেসের ও এক্সিবিশন করেন সে সময়। সেই এক্সিবিশন কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ সহধর্মিণী অভিনেত্রী শাওন এসেছিলেন এবং সুজানার কেকের প্রশংসা করেছিলেন।

২০১৬ সালে প্রথম মিডিয়ায় রান্নার কাজ শুরু করেন। অনলাইনের বিভিন্ন ধরনের কুকিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একে এক বেশ কিছু পুরষ্কার পাওয়ার পর তার আগ্রহ বেড়ে যায় দ্বিগুণ। শুরুটা ছিলো অনলাইন কুকিং প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে। সুজানার ফুড রেসিপি, স্পুন, আনন্দ ধারা, কালের কণ্ঠ ম্যাগাজিন, কালের কণ্ঠ পত্রিকা, সমকাল, প্রথম আলো, দেশ রূপান্তর সহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায় ছাপা হয়।

২০১৮ সালে ড্যান কেক রিয়েলিটি শো এটিএন বাংলায় শুরু হলে সেখানে অংশ নেন। এছাড়া যমুনা টেলিভিশনের কুকিং শোতেও রান্নার কাজ করেছেন। নাভানা মিট কন্টেস্ট এর উইনার হয়ে লাইভ কুক এর প্রোগ্রাম করেছেন। সাথে আড়ং বাটার, ডিপ্লোমা মিষ্টির লড়াই সহ বহু প্রোগ্রামে তিনি অংশ নিয়ে সিলেক্ট হয়েছেন। হোস্টেল, ড্রেস হাউজ, হোম মেইড কেক, বিয়ের পার্টির ফুড আইটেম এর অর্ডার ডেলিভারি দেয়ার পাশাপাশি ক্যাটারিং ইন্সটিটিউট নিয়ে দিন কাটে সুজানার। দুই ছেলে আর স্বামী নিয়ে ধানমন্ডিতে নিজ ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ সুজানা সুমীর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে তার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। সুজানার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।