পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা কাকলী

0
258

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী, পর্যটন প্রশিক্ষক এবং পর্যটন উদ্যোক্তা কাকলী সাহা কলির পথচলার গল্প।

হাওড় বাওড় মহিষের শিং এই তিনে ময়মনসিংহ সেই নান্দনিক জেলায় ১৯৮১ সালে কাকলীর জন্ম। বাবা সরকারি সমবায় অফিসার ছিলেন আর মা গৃহিণী। ২ ভাই আর ২ বোনের মধ্যে কাকলী সবার ছোট। বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা কেটেছে মানিকগঞ্জ শহরে। ১৯৯৬ সালে খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন খান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন এবং ১৯৯৮ সালে মানিকগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন । এরপরেই পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয় । স্বামীর চাকরি সূত্রে রাঙামাটি যান। সেখানকার রাঙামাটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ২০০০ সালে বিএসএস পাশ করেন । এরপরই ছেলের জন্ম হয়। কিন্তু কাকলীর পড়াশোনা থেমে থাকেনি। স্বামীর বদলি হয় চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাশ করেন ২০০২ সালে। কাকলীর স্বামী অরুপ কুমার সাহা, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডে (কারওয়ান বাজার ব্রাঞ্চ) ম্যানেজার (সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট) হিসেবে কর্মরত। কাকলীর ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) তড়িৎ এবং ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল (EEE – ১ম বর্ষ) পড়ে, মেয়ে আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে (মতিঝিল) পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।

কাকলীর রান্নার হাতেখড়ি মায়ের হাতেই, বাবাও খুব ভালো রান্না করতে পারেন। স্কুলে পড়ার সময়ই বিকলের নাস্তা বানাতেন । বিভিন্ন পিঠা, পায়েস, স্নাকস্ আইটেম বানিয়ে পরিবারের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতেন। আশেপাশের সবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন। এইচএসসি পাস করার পরই কাকলীর বিয়ে হয়ে যায় , রান্নাবান্না সংসার সামলে স্বামীর সহযোগিতায় মাস্টাস পাস করেন। চাকরি করার প্রবল ইচ্ছা কাজ করত। স্কুলের চাকরি পেয়েও যান। ২০০৫- ২০০৭ স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ছোট ছেলেকে বাসায় রেখে স্কুলের জব টা আর করা হয়নি। কিন্তু কিছু একটা করতে হবে, এই তাগিদ সব সময় অনুভব করতেন। তখন থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করলেন রান্না নিয়েই নিজের স্বাধীনমত বাসায় থেকেই কাজ করা যায়। তিনি জানতেন, যে কাজে ভালবাসা আছে সে কাজ দিয়ে ভাল কিছু করা সম্ভব ।

বিয়ের পর শশুর বাড়ীতেও তার রান্নার সুনাম রয়েছে। বাড়ীতে মেহমান আসলে ভাল ভাল রান্নার দায়িত্ব তার উপরই পড়ত। ২০১১/২০১২ সাল থেকেই বিভিন্ন পত্রিকায় তার রেসিপি প্রকাশ হতে থাকে, এবং তার রান্না করা খাবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি তখন বাসায় রান্না শেখানো শুরু করেন। সাথে সাথে কেটারিং শুরু করেন । বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার স্পেশাল কিছু রেসিপি সবাই খুব পছন্দ করেন। ২০১৫/২০১৬ সালে স্কুল টিফিন অর্ডার নিতেন। বাচ্চারা খুবই পছন্দ করতো তার তৈরি খাবার। খাবারের স্বাদ ভাল হওয়ায় তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। খাবারে ফিউশন এনে নতুন নতুন খাবার তৈরীর প্রবল ইচ্ছা কাজ করে কাকলীর মধ্যে। খাবারের গুনাগুন, প্রেজেন্টেশন, এবং হাইজিন নিয়েও তিনি বেশ সচেতন। পরবর্তীতে টিভিতে বিভিন্ন রান্নার অনুষ্ঠান করেন নিজেকে আরও তৈরি করতে তিনি রান্নার বিভিন্ন ট্রেনিং নেন।

কাকলী ২০১৭ সালে ITICA প্রতিষ্ঠান থেকে NTVQF level – 1 এবং UCEF প্রতিষ্ঠান থেকে NTVQF level – 2 প্রশিক্ষণ শেষ করেন। ২০১৮ সালে BKTTC প্রতিষ্ঠান থেকে Level 4 – কুকিং এসেসর হিসাবে প্রশিক্ষণ শেষ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কুকিং এসেসর হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কাকলী জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনে ৫ বছর কালিনারী এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করেছেন, এবং এশিয়ান টিভিতে রান্নার অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও এক্সপার্ট এর দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া এটিএন বাংলা জিটিভি, এনটিভি, বৈশাখী টিভি, যমুনা টিভি, চ্যানেল নাইন, দীপ্ত টিভি সহ সকল টিভিতে রান্নার প্রোগ্রামে অংশ নেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল “জি বাংলায় ” রান্নার অনুষ্ঠান করেছেন। ভারতের জনপ্রিয় ফুড ম্যাগাজিন হ্যাংলা হেসেলে রেসিপি দিয়ে থাকেন। নিয়মিত দৈনিক জনকণ্ঠ , আমাদের সময় , ডেইলি অবজারভার পত্রিকায় রেসিপি লেখেন। বর্তমানে, আর.এফ.এল, রুপচাঁদা , স্যামসাং ইত্যাদি কোম্পানীর সাথে কাজ করছেন।

পর্যটন উদ্যোক্তা হিসাবে কাকলী ২০১৭ সালে ” Right kitchen ” নামে একটি কুকিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন । নিয়মিত রান্না বিষয়ক কোর্স করান। এছাড়া হোমম্যাড ফুড ক্যাটারিং করছেন সেই প্রতিষ্ঠান থেকে। এছাড়া “Food venture by kakoli” নামে ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে তার। সেখানে খুব সহজভাবে রান্না দেখানো হয়। যার কারনে চ্যানেলটি গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে । ২০১৩ সালে এবং ২০১৬ সালে সেরা রন্ধনশিল্পী প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথমস্থান অর্জন করেন। বিচারক হিসাবে ২০১৯ সালে রূপচাঁদা সুপার শেফ প্রতিযোগিতায় দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রতিটি মানুষই কাজের স্বীকৃতি পেলে খুশি হয় কাকলীর বেলায় বিষয়টা এমনই। ইতিমধ্যেই তিনি মাদার তেরেসা মেমোরিয়াল সম্মাননা – ২০১৭, আজকের বিনোদন সম্মাননা ২০১৭, AJFB Star Award – ২০১৮ পেয়েছেন। এই গুণী রন্ধন শিল্পী, পর্যটন উদ্যোক্তা কাকলী আগামী দিনে আরো বড় কিছু কাজ করতে চান, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ কাকলী সাহা কলির উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে তার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। কাকলীরব এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।