পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা সারা

0
373

ভুমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রানান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন সুভেনির নির্মাতা ও সরবরাহকারী, পর্যটন উদ্যোক্তা কাজী সানজিদা আক্তার সারার পথচলার গল্প।

সারা ১৯৯২ সালে লালমনিরহাট জেলায় জন্মগ্রহন করেন। চার ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট। বাবা ঢাকা নবাবগঞ্জ ও মা সোনারগাঁও এর হলেও শৈশব কৈশোর বেড়ে ওঠা লালমনিরহাট জেলায়। বর্তমানে কর্মের সুবাদে ঢাকার মিরপুরে বসবাস করেন এই নারী উদ্যোক্তা।। লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে মাধ্যমিক এবং মজিদা খাতুন সরকারী মহিলা কলেজ থেকে ২০১০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পদচারনা ছিল তার। সায়াহ্ন কবিতা সংসদ ও মহুয়া সাহিত্যাঙ্গনে আবৃত্তিতে প্রশিক্ষণ নেন। অর্জন করেন বেশ কিছু পুরষ্কার ও সার্টিফিকেট। বিভিন্ন খেলাধুলায় ও অংশগ্রহন করতেন। পরবর্তীতে অনার্সে ভর্তি হলেও বিয়ে এবং পারিবারিক কারনে পড়াশোনা বন্ধ হ্য়।বর্তমানে সারা দুই সন্তানের জননী।

ছোট বেলা থেকেই ক্রাফটিং করতে ভালোবাসতেন। নতুন নতুন জিনিস তৈরী করার চেস্টা করতেন। তাছাড়া মেজো বোন হাতের কাজে বেশ পারদর্শী ছিলেন। সেই অর্থে ক্রাফটিং এর হাতে খড়ি তার হাত ধরেই। অষ্টম শ্রেণীতে থাকা কালীন আমেরিকান এক শিক্ষিকা আসেন স্কুলে। তার কাছ থেকে জানতে পারেন কিছু ক্রাফটিং এর কথা। তিনি একটা ক্যাম্প খুশির আয়োজন করেন যেখানে পেপার ক্রাফটিং, ড্রয়িং,মার্শাল আর্ট, নাচ এর কর্মশালা হয় ৩ দিন। সেই স্মৃতি গুলো ভোলার নয়। তাছাড়া বিশ্ব মানচিত্র অংকন এর একটি প্রজেক্টে অংশগ্রহণ করেছিলাম সেই ম্যাডামের সাথে। কাকতালীয় ভাবে ম্যাডামের নামের সাথে তার নামের মিল থাকায় তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। ক্রাফটিং এর বিভিন্ন সামগ্রীও সারাকে গিফট করেছিলেন। এটা বলার উদ্দেশ্য তখনো সারা বুঝতে পারেনি ক্রাফটিংটাকেই পেশা হিসেবে নিবে।

স্বামীর অনুপ্রেরনায় হস্তশিল্প নিয়ে কাজ শুরু করা। বাচ্চাদের সময় দিয়ে কাজ করতে প্রথমে প্রশিক্ষণ নেন ক্লে বা কৃত্রিম মাটির। ২০০০ টাকা দিয়ে কাঁচামাল ক্রয় করে পণ্য উৎপাদন শুরু করেন। প্রথমেই হোচট খান কারন পণ্য গুলো নস্ট হচ্ছিলো। সমস্যার সমাধান খুজতে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেন। আস্তে আস্তে ক্লের পণ্য তৈরী সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারেন। তৈরী করতে থাকেন ক্লের নতুন নতুন ডিজাইনের বাহারী পণ্য। ক্লে শোপিস, গহনা, ক্লে দিয়ে পটারী ডিজাইন, মাথার ব্যান্ট, হিজাব পিন ইত্যাদি পন্য। এগুলো দেশ ও দেশের বাহিরেও যায় বিভিন্ন ক্রেতার মাধ্যমে। বর্তমানে সারা ৭ রকমের ক্লের কাজ করেন। তাছাড়া পাটের বিভিন্ন পণ্য, গহনার উপর প্রশিকষণ নেন।

মনের একটা সুপ্ত বাসনা কিছু লোকের কর্মসংস্থান তৈরী করবেন। সে লক্ষ্যে কাজ শুরুও করে দিয়েছেন। প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলে প্রশিক্ষিত হয়ে নিচ্ছেন। সারা হ্যান্ডিক্রাফটস এর পণ্য দেশের অভ্যন্তরে পাইকারী ও খুচরা বিক্রয় হচ্ছে। তাছাড়া ভারতের মেলায় সারার পন্য বেশ সাড়া পায়। বতর্মানে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশী সারা হ্যান্ডক্রাফটস এর পণ্য নিয়ে বিদেশে বিক্রয় করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এতে কর্মসংস্হান তৈরীর একটা ইতিবাচক দিক তৈরি হয়েছে। প্রতিটা কাজের পেছনে মানুষের ভালো, মন্দ কথা তো থাকবেই। স্বামীর সহযোগিতার কারনে এগুলো তাকে টলাতে পারে না, বরং মজবুত করে।

২০১৯ সালে সারা হ্যান্ডিক্রাফটস নামে অনলাইন প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। অনলাইন ভিত্তিক ব্যাবসা হওয়ায় কাস্টমার রিভিউটার অনুভুতি চমৎকার। এবং সরাসরি ক্রেতাদের সাথে যুক্ত হতে পেরে অভিজ্ঞতা ও হয় প্রচুর। যা সৃজণী চিন্তা শক্তিকে আরও মজবুত করে তোলে। আমি সারা তার বাবা, মা, ভাই, বোন ও পরিবারের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা সব সময় সাপোর্ট দেন। বড়বোন লালমনিরহাটে থাকেন, তিনি সেখানে সারা হ্যান্ডিক্রাফটস এর টিম তৈরীর দায়িত্ব নিয়েছেন। কাজ করছেন নিরলস ভাবে। তার মাঝের সুপ্ত প্রতিভাটাকে কাজে লাগাতে সব সময় অনুপ্রাণীত করেন। বর্তমানে করনোর কারনে কাজে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যে প্লানে কিছু কাজ হাতে নিয়েছিলেন তার পরিবর্ত করতে হয়েছে। তবে থেমে নেই কাজ। প্রতি নিয়ত চিন্তা করেন কিভাবে আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে ব্যবসাটাকে এগিয়ে নেয়া যায়। নতুন নতুন পণ্য উপহার দেয়া যায় মানুষকে।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ কাজী সানজিদা আক্তার সারার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে সানজিদার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। সারার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।