দিনাজপুরের পথে, ঐতিহ্য আর স্বপ্নপুরীর দেশে —রোদেলা নীলা

0
116

আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী
সাথি মোদের ফুলপরি
ফুলপরি লালপরি লালপরি নীলপরি
সবার সাথে ভাব করি।

সত্যিকারের পরিদের সাথে ভাব করতে না পারলেও কল্পনার পরিকে চোখের সামনে একবার দেখবার তৃষ্ণা নিয়েই ছুটে চলেছি স্বপ্নপুরীর উদ্দেশ্যে। দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৫২ কিমি দক্ষিণে নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জে স্বপ্নপুরী অবস্থিত। বাসযোগে যাওয়া যায় আবার ঢাকা থেকে চলে আসা সম্ভব । অনেকে রেলযোগে ফুলবাড়ী রেল স্টেশনে নেমে অটোরিক্সা নিয়ে চলে যেতে পারেন। কিন্তু আমি শহর থেকেই একটা গাড়ি নিয়ে নিলাম সারাদিনের জন্য ।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ চলছে, শীতের হালকা আমেজ বয়ে যাচ্ছে রোদ মাখা সোনালি ধানের শীষে । দু’ধারে সারি সারি ধানের ক্ষেত, মাঝে মাঝে চড়ুই পাখির দুর্নিবার উড়ে চলা -এমন সকাল বহুদিন দেখা হয় না।সময় যতো এগুচ্ছে মনে হচ্ছে কোন এক জন-মানবহীন শূণ্য পীচ ঢালা পথের সাথে সখ্যতা করে এগিয়ে চলেছি ।

সকাল এগারোটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বহু প্রতিক্ষীত স্বপ্নপুরীর দুয়ারে। আমরা আসবো জেনেই বুঝি দু দু’টো পরী স্বাগতম জানাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।উফ! মাটি বা পাথর দিয়ে গড়া এই মূর্তি এতোটা প্রা্নবন্ত করে দিল কোন সে শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় নাম আর জানা হলো না । কেবল জানতে পেরেছি দিনাজপুর – ৬ আসনের এমপি শিবলী সাদিকের বাবা তার নিজ জমিতে একক উদ্যোগেই এই নয়নাভিরাম প্রাঙ্গণ সম্পূর্ণ করেছেন ১৯৯০ সালে । প্রায় দেড়শো একর জমি জুরে আছে নানাবিধ পশু-পাখি-মাছ এমন কি কৃত্রিম ফুলের সমাহার । আছে দেবদারু গাছের বাগান , আকর্ষনীয় চিড়িয়াখানা, আদতে মূর্তি হলেও পরিবেশনায় সবগুলোই প্রাণবন্ত।

বাইরে থেকেই ডায়নোসরের মাথাটা দেওয়াল ছাপিয়ে উঁকি দিচ্ছিল। ছবিতে দেখা ডায়নোসর আর এই ডায়নোসরে অনেক তফাৎ । এত্তো বড় একখানা লেজ নিয়ে অনেক খানি জায়গা বিস্তার করে আছে।পিছনের জন পিঠে নিয়ে হাঁটছে তার বাচ্চাটাকে ।পদ্মপাতাগুলো একদম জীবন্ত , জলে ভাসা ফুল। হঠাৎ কোথা থেকে যেন এক ঝাঁক প্রজাপতি আমার মাথার চারপাশে ঘুরতে আরম্ভ করে দিল।লাল রঙের বাগান বিলাশের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছে অদ্ভূৎ সব জন্তু।খোকড়া আছে একদম ফনা তুলে আর লাল -কালো ডোরা কাটা সাপ পেঁচিয়ে রেখেছে ঘন জঙ্গল।মনে হচ্ছিল ডিস্কভারি চ্যানেলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

আমি ছবি তুলতে তুলতে ইকড়ি মিকড়ির কাছে চলে গেলাম,পাশে স্পাইডারম্যান নীচের দিকে নামছে।আর চার্লি চ্যাপলিন সেই চিরচেনা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে এক পা তুলে।বিশাল আয়তনের পুকুরের মাঝখানে অপরূপ ভঙ্গিমায় সাদা পরীর চারপাশ দিয়ে ঝরে পরছে জলের ফোয়ারা ।কী তার ছন্দ, শুনশান নিস্তব্ধ মধ্য প্রহর তখন একরাশ নির্জনতা ছাপিয়ে পুকুরে সাঁতার কাটতে ব্যস্ত।যেদিকে তাকাই কেবলই মুগ্ধতা নেমে আসে দু’চোখ বেয়ে।মাটি দিয়ে বানানো রয়েল বেঙ্গল আর সিংহ কেবল নয়,যাদের যে জায়গাটাতে মানাবে ঠিকঠাক সে জায়গাটাকেও তার বসবাসের উপযুক্ত করে বানানো হয়েছে ।এমন বিচক্ষণ বুদ্ধি যার মগজে তাকে একবার দেখবার বেশ তৃষনাই থেকে গেল। সাপের আদলে ডাস্টবিন বানানোর এমন চমৎকার আইডিয়া কিভাবে এই নির্মাতা পেলেন তা কে জানে !

এতো বড় জায়গা, হেঁটে হেঁটে হাপিয়ে গেলাম কিন্তু দেখার আগ্রহ আর ফুরোয় না। যেখানেই পা রাখছি কেবল থমকে গিয়ে ছবি তুলে নিচ্ছি। জবা ফুল যে এতো বড় হতে পারে তা কোন ভাস্করের হাতে বানানো ফুল দেখেই জানলাম। তিনখানা রঙ দিয়ে সাজানো-লাল,সাদা আর হলুদ। কেউ যদি সর্ব বৃহৎ একতারা দেখতে চান তবে ঘুরে আসুন স্বপ্নপুরী। এই ব্যস্ত নগরীতে এমন করে প্রকৃতি আর মানুষের অপরূপ সমন্বয় আর কেউ এভাবে ফোটাতে পারেন নি।রবীন্দ্রনাথের গা ছুঁয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলাম,তারপর ঢুকে গেলাম মাছেদের রাজ্যে ।এতো জল, চারদিকে কেবল জল পড়ছে তার মাঝে মৎস কন্যারা ভিজিয়ে নিচ্ছেন তাদের অপূর্ব দেহ-পল্লব। কতো জাতের মাছ যে এখানে আছে তার কোন হিসেব নেই ।

একদিনে এতো বড় প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখে শেষ করা যাবে না। নাতনীর জন্য যে বাস ভূমি তিনি বানিয়েছেন তাকে সোজা কথায় রাজপ্রাসাদ বললে এতোটুকুও বাড়িয়ে বলা হবে না। সত্যি কোন এক রাত জাগা চন্দ্রিমা আলোয় একবার ডাকবাংলোয় থেকে হৃদয়ে মেখে নিতে হবে স্বপ্নপুরীর অপার সৌন্দর্য।

বিকেলের সোনা ঝরা রোদ তখন ধীরে ধীরে সবুজ গাছগুলোকে ছুঁয়ে দিতে লাগলো । সৌন্দর্য্য স্নানে মগ্ন আমরা হঠাৎ অনুভব করলাম পেটে ক্ষুধার আর্ত চিৎকার ।সদর দরজার বাইরে দুটো খাবার হোটেল চোখে পড়েছিল, কিন্তু মান নিয়ে সংশয় ওঠায় ভেতরেই খুঁজে নিলাম একটি রেস্তোরা। সেখানে কাজ চলছিল,আয়তনে বেশ বড় ।দেশি মুরগীর মাংস চিবাতে চিবাতে মনে হলো -পর্যটন কর্পোরেশন কেন এখানে একটি রেস্তোরা খুলছে না।অনেকটা সাভার স্মৃতিসৌধের পাশে জয় রেঁস্তোরার মতোন।পর্যটকরা অন্তত উঁচু মানের খাবার পাবে ,কারণ এখানে শীত মৌসুমে বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যায়।পর্যটকদের বিনোদনের জন্য আরো আছে বিশাল দিঘিতে স্পিডবোটে বেড়ানোর সুবিধা এবং ময়ূরপংখী, দুইঘোড়া চালিত টমটম, স্বচ্ছ পানির ফোয়ারা বিশিষ্ট কয়েকটি ফুল বাগান এবং বিশ্রামের জন্য আকর্ষণীয় রেষ্টহাউস ও ডাকবাংলোসহ বিনোদনের আরো অনেক উপকরণ।

সন্ধ্যা লেগে এলে পর্যটন কর্পোরেশন মোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম,ওখানকার ম্যানেজারই আমাকে বার বার বলে দিয়েছি্লেন দিনাজপুর ছাড়ার আগে যেন স্বপ্নপুরী দেখে যাই।আসলেই এমন জায়গায় বাচ্চাদের নিয়ে এলে , এল সি ডি- তে বসে ডিস্কভারি বা এনিম্যাল প্ল্যানেট দেখতে হবে না।জীবন্ত হয়ে পশু পাখীরা চোখের সামনে সারাক্ষন ভাসতেই থাকবে ।

লোকে লোকারণ্য কান্তজির মন্দির

পরদিন খুব সকালে উঠেই মন্দির দেখতে চলে গেলাম । তখন স্থানীয় একটা মেলা চলছিল ,তাই কান্দজির মন্দির প্রাঙ্গণ জুড়ে ছিল দর্শনার্থীদের ভীড় আর হরেক রঙের স্টল। মজার মজার আচার আর কটকটি দিয়ে ভরা। আমরা ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম মূল বেদীতে । বাংলাদেশের দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে, দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরে অবস্থিত এটি একটি প্রাচীন মন্দির। এটি নবরত্ন মন্দির নামেও পরিচিত কারণ তিনতলাবিশিষ্ট এই মন্দি্রের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিলো।

তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তাঁর শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। শুরুতে মন্দিরের চূড়ার উচ্চতা ছিলো ৭০ ফুট। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি ভূমিকম্পের কবলে পড়লে এর চূঁড়াগুলো ভেঙে যায়। মহারাজা গিরিজানাথ মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার করলেও মন্দিরের চূড়াগুলো আর সংস্কার করা হয়নি।

মন্দি্রের চারপাশে চলছে নানান রকম ব্যবসা। জমকালো পিরামিড আকৃতির মন্দিরটি তিনটি ধাপে উপরে উঠে গিয়েছে এবং তিন ধাপের কোণগুলির উপরে মোট নয়টি অলঙ্কৃত শিখর বা রত্ন রয়েছে যা দেখে মনে হয় যেন একটি উঁচু ভিত্তির উপর প্রকাণ্ড অলংকৃত রথ দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরের চারদিকে খোলা পথ রয়েছে যাতে যেকোনো দিক থেকেই পূজারীরা ভেতরের পবিত্র স্থানে রাখা দেবমূর্তিকে দেখতে পান।

পূন্যার্থিরা বেশ ব্যস্ত ছিল পূজো দিতে । বর্গাকৃতির মন্দিরটি একটি আয়তাকার প্রাঙ্গনের উপর স্থাপিত। এর চারদিকে রয়েছে পূজারীদের বসার স্থান যা ঢেউটিন দ্বারা আচ্ছাদিত। বর্গাকার প্রধান প্রকোষ্ঠটিকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ ইমারত নির্মিত হয়েছে। পাথরের ভিত্তির উপর দাঁড়ানো মন্দিরটির উচ্চতা ৫০ ফুটেরও বেশি। ধারণা করা হয়, গঙ্গারামপুরের (দিনাজপুর) নিকট বাননগরের প্রাচীর ধ্বংসাবশেষ থেকে নির্মাণ উপকরণ এনে এটি তৈরি করা হয়েছিল। বাইরের দিকে উঁচু করে তৈরি তিনটি চতুষ্কোণাকার প্রকোষ্ঠের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের নকশা কেন্দ্রীয় প্রকোষ্ঠটিকে শক্তিশালী করেছে, তাই উপরের বিরাট চুড়াটিকে এ প্রকোষ্ঠটির পক্ষে ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।

দিনাজপুর জেলা সদর থেকে কান্তজির মন্দিরের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। তবে এর আশে পাশে কোন ভালো হোটেল বা থাকার জায়গা নেই। শহরে থেকেই ঘুরতে হবে মন্দিরটি।

নয়নাভিরাম নয়াবাদ মসজিদ

শহর হতে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কাহারোল উপজেলার নয়াবাদ গ্রামে অবস্থিত এই নয়াবাদ মসজিদ। ১.১৫ বিঘা জমির উপর এই মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে। মসজিদের প্রবেশের প্রধান দরজার উপর স্থাপিত ফলক থেকে জানা যায় এটি সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের রাজত্ব কালে ২ জৈষ্ঠ্য, ১২০০ বঙ্গাব্দে(ইংরেজি ১৭৯৩ সালে) নির্মান করা হয়। সেসময় জমিদার ছিলেন রাজা বৈদ্যনাথ। যিনি ছিলেন দিনাজপুর রাজ পরিবারের সর্বশেষ বংশধর। ১৮ শতকের মাঝামাঝিতে কান্তনগর মন্দির তৈরির কাজে আগত মুসলমান স্থপতি ও কর্মীরা এই মসজিদটি তৈরি করেন। তারা পশ্চিমের কোন দেশ থেকে এসে নয়াবাদে বসবাস শুরু করেন এবং তাদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য এই মসজিদটি তৈরি করেন।

তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের চার কোনে চারটি অষ্টভুজ মিনার রয়েছে। দেয়ালগুলির পুরুত্ব ১.১০ মিটার। উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে একটি করে জানালা রয়েছে। পশ্চিম পাশের দেয়ালে মোট তিনটি মিম্বার রয়েজছে যেগুলি মসজিদের তিনটি প্রবেশ দরজা বরাবর তৈরি করা হয়েছে। মাঝের মিম্বারটি আকারে বড়(উচ্চতা ২৩০ মিটার এবং প্রস্থ্য ১.০৮ মিটার) এবং অপর দুটি মিম্বার একই আকারের। মসজিদটা তৈরির সময় যে সকল টেরাকেটা বা পোড়ামাটির কারুকার্য ব্যবহার করা হয়েছিল তার অধিকাশংই এখন নেই এবং যেগুলি রয়েছে সেগুলিও সম্পূর্ণ অক্ষত নেই। এখানে বর্তমান মোট ১০৪টি টেরাকোটা অবশিষ্ট রয়েছে।

মসজিদটির পাশে একটি কবর রয়েছে। তবে কবর বা মসজিদে কোন অংশেই এটি সম্পর্কিত কোন তথ্য দেয়া নেই। তবে কথিত আছে যে এটি মসজিদের কোন নির্মান শ্রমিকের কবর।

নির্জনতার শীতল পরশ রামসাগর উদ্যান

মানুষের ভিড় দেখতে দেখতে আর ইতিহাস মুখস্থ করতে করতে একসময় হাঁপিয়েই উঠলাম।তাই পড়ন্ত বিকেলের রোদ যখন পশ্চিমে হেলে পড়ছে তখন উপস্থিত হলাম দেশের ঐতিহাসিক রামসাগরে । রাজা রামনাথের কীর্তি রামসাগর মহাকালের এক অনন্য কীর্তি । এটাকে ছোট খাট একটা সাগর বললে কম বলা হবে না। রামসাগর জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামে অবস্থিত একটি জাতীয় উদ্যান। এটি দিনাজপুর সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে রামসাগর দিঘিকে ঘিরে অবস্থিত। ১৯৬০ সালে রামসাগর বাংলাদেশের বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আনা হয় এবং ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রামসাগর উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ হলো বিশাল রামসাগর দিঘি। দীঘিটি উত্তর দক্ষিণ লম্বা এবং এর জলভাগের দৈর্ঘ্য ১০৩১ মিটার, প্রস্থ ৩৬৪ মিটার ও গভীরতা ৯ মিটার। দক্ষিণ দিকের চেয়ে উত্তর দিকের গভীরতা বেশি। দীঘির প্রধান পাকা ঘাট পশ্চিম পাড়ের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এবং ঘাটটির দৈর্ঘ্য ১৫০ ফুট ও প্রস্থ ৬০ ফুট।

কথিত আছে, ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রচণ্ড এক খরা দেখা দিলে পানির অভাবে মৃতপ্রায় প্রজাদের বাঁচাতে দয়ালু রাজা প্রাণনাথ স্বপ্নে আদেশ পেয়ে একটি পুকুর খনন করেন। কিন্তু সেই পুকুর থেকে পানি না ওঠায় একসময় রাজা স্বপ্নে দৈববাণী পেলেন যে, তার একমাত্র ছেলে রামকে দীঘিতে বলি দিলে পানি উঠবে। স্বপ্নাদিষ্ট রাজা, দীঘির মাঝখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন। তারপর এক ভোরে যুবরাজ রামনাথকে নিয়ে হাতির পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন সেই দীঘির দিকে। দীঘির পাড়ে পৌঁছে যুবরাজ রাম সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন মন্দিরে। সঙ্গে সঙ্গে দীঘির তলা থেকে অঝোর ধারায় পানি উঠতে লাগল। চোখের পলকে যুবরাজ রামনাথসহ পানিতে ভরে গেল বিশাল দীঘি।

দীঘিটি খনন করতে সে সময়ের হিসেবে প্রায় ৩০,০০০ টাকা ও ১৫,০০,০০০ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়েছিল বলেও জানা যায়। দীঘিকে ঘিরে আছে এই জাতীয় উদ্যানে হাঁটার জন্য ইট বিছানো পথ ও দীঘির পাশে বসার জায়গা ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট ও একটি ছোট চিড়িয়াখানা। আমি খোলা ঘাসের উপর খানিক বসে জিরিয়ে নিলাম,মনে হচ্ছে প্রশান্ত জলাশয় ঘিরে আছে আমার চারপাশ।

খাবার গাড়িতেই ছিল,সেটি নিয়ে বন বিভাগের রেস্ট হাউজে চলে গেলাম।এতো বড় ডাইনিং প্লাস ড্রইং রুম খুব কমই চোখে পড়ে আজকাল ।এই রেস্ট হাউজের ভেতরে ঢোকার পথটি গাছ দিয়ে সাজানো ।আছে রাত্রী যাপনের খুব ভালো ব্যবস্থা।কিন্তু ফিরে যেতে হবে বলে কেবল ফোন নম্বরটি জোগার করে নিলাম। ফোন: ০৫৩১-৬৫৫৫৮ ফ্যাক্স: ০৫৩১-৬৩০৯০

মিষ্টির ভাণ্ডার পাবনা সুইটস

দিনাজপুরের মতোন একটি ঐতিহাসিক জায়গায় পাবনা সুইটস নামটা বেশ বেমানান ঠেকলো ।কিন্তু খুব কাছের একজন বন্ধু বলে দিল শ্যামল কুমার ঘোষের এই মিষ্টির ভাণ্ডার থেকে মিষ্টি নেবার কথা । বগুড়ার দই সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশি জানি, তবে পাবনা সুইটসের সাদা দই মুখে দেবার পর কিন্তু বগুড়ার দই হার মেনেই গেল।আরো কতো রকমের ছানা আর সন্দেশ যে খেলাম তা লিখতে গেলে বিরাট লিস্ট হয়ে যাবে। শ্যামলদার নিজেরই একটি কোল্ড স্টোর আছে যেখানে থরে থরে মিষ্টি রিজার্ভ করে রাখা হয়েছে ।তাই মিষ্টি নষ্ট হবার কোন উপায় নেই। মালিকের নিজের ডেইরী ফার্ম থেকে উৎপাদিত দুধ থেকেই এই মজাদার বস্তটি তৈরী।তাই অনেকেই বলেন পাবনা সুইটসের দাম বেশি, কিন্তু তার ভেতরের গল্প সবাই জানে না।

নিজেস্ব কারখানায় কয়েকশ কর্মী দিয়ে মিষ্টি তৈরীর পক্রিয়া চলছে বেশ স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে ।দোতলা বিশিষ্ট এই ভবনে আছে নানা ধরণের মিষ্টি তৈরির যন্ত্র।আমি জানতাম মিষ্টি হাতে তৈরি হয়, এই প্রথম দেখলাম এক এক আকারের মিষ্টির জন্য এক এক ধরণের মেশিন। এতো উন্নত পক্রিয়ায় যে বস্তুটি তৈরি হয় তার সঠিক বিচারতো করতেই হবে। অবশ্য ,আমাকে কোন বিচার আচার করতে হয় নি । এক গাদা মিষ্টি উপহার নিয়ে সোজা উঠে গেলাম ঢাকার বাসে। আর এসি থাকাতে মিষ্টি ছিল পুরোই টাটকা ।

ঢাকা থেকে দিনাজপুর যাবার উপায়

ঢাকা থেকে বাস ও ট্রেন দুই পথেই যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী বাসগুলো সাধারণত ছাড়ে গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে। এ পথে নাবিল পরিবহনের এসি বাস চলাচল করে। ভাড়া ১০০০ টাকা। এ ছাড়া হানিফ এন্টারপ্রাইজ ,কেয়া পরিবহন, এস এ পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন-, নাবিল পরিবহনের নন-এসি বাসও চলাচল করে এ পথে । ঢাকা থেকে আসাদগেট, কলেজগেট, শ্যামলী, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল মোড় অথবা গাবতলী হতে নাবিল, বা বাবলু এন্টারপ্রাইজের চেয়ার কোচে করে সরাসরি দিনাজপুর ।

ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন দ্রুতযান এক্সপ্রেস ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে। আর আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে। ঢাকা থেকে একতা ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস বন্ধ থাকে যথাক্রমে মঙ্গল ও বুধবার। ।

থাকার জায়গা

দিনাজপুর শহরে থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল হচ্ছে পর্যটন মোটেল (০৫৩১-৬৪৭১৮)। এ ছাড়া ঢাকায় পর্যটনের প্রধান কার্যালয় থেকেও এ মোটেলের বুকিং দিতে পারেন। ফোন :০১৭৭৫৮৮৩৩৫৫।

এ ছাড়া দিনাজপুরের অন্যান্য সাধারণ মানের হোটেলে ১০০০-১২০০ টাকায় রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে। কয়েকটি সাধারণ মানের হোটেল হলো— মালদহ পট্টিতে হোটেল ডায়মন্ড , নিমতলায় হোটেল আল রশিদ, হোটেল নবীন , হোটেল রেহানা এবং নিউ হোটেল ।

এছাড়া আপনি চাইলে রামসাগরের ভিতরে অবস্থিত বাংলোতেও থাকতে পারেন। এখানে থাকতে হলে স্থানীয় বন বিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হয়। একতলা ভবনটিতে তিনটি সাধারণ এবং একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ আছে। প্রতিটি সাধারণ কক্ষের ভাড়া প্রতি রাত ৫০০ টাকা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের ভাড়া ১০০০ টাকা। নিজেদেরই খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। রাতের বেলা রামসাগর দীঘির পাড়ে অসাধারন একটি রাত কাটানোর মোক্ষম সুযোগ হবে এটি। ফোন: ০৫৩১-৬৫০৫৬ ।

তবে আমি আবার দিনাজপুর গেলে অবশ্যই স্বপ্নপুরীতে থাকার ব্যবস্থা করেই যাব।ঢাকা থেকে বুকিং ব্যবস্থা ঢাকা থেকেও স্বপ্নপুরীর মোটেল বা বাংলো বুকিংয়ের সুবিধা আছে। ঠিকানা : হোটেলের সফিনা, ১৫২ হাজী ওসমান গনি রোড, আলুবাজার ঢাকা। ফোন : ৯৫৫৪৬৩০-৯৫৬২১৩০ ।

নির্বাহী সম্পাদক, দি ট্যুরিজ্‌ম ভয়েজ