পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা শারমীন

0
153

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী এবং পর্যটন উদ্যোক্তা শারমীন ইসলাম এর পথচলার গল্প।

শারমীন ইসলাম চট্রগ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে ১৯৮৮ ইং সনের জুন মাসে জন্ম গ্রহন করেন| বাবার ব্যবসার কারনে ঢাকার ওয়ারীতে স্থায়ী বসবাস | শৈশব থেকে শুরু করে বিয়ের আগ পর্যন্ত ওয়ারীতেই সবকিছু | চাচারাও সবাই ব্যবসার সুবাদে চট্রগ্রাম থেকে এসে ওয়ারীতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন ।আর একমাত্র ফুফু বিয়ের পর চাকরির কারণে সুদূর যুক্তরাস্ট্রে চলে যান স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে | দুই ভাইবোনের মধ্যে শারমীন বড় | ছোট ভাই সানাউল ইসলাম সানী “এ লেভেল“ পাস করে পড়াশুনার পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করে আজ ছোটখাটো একজন সফল ব্যবসায়ী | ওয়ারীর “সিলভারডেইল” স্কুলে নার্সারি ক্লাসে ভর্তির মাধ্যমে আমার জীবন শুরু | ২০০১ সালে মাধ্যমিক এবং ২০০৩ সালে শেরে বাংলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাস্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক শ্রেনীতে অধ্যায়ন শুরু করেন | পড়াশুনার প্রতি বিশেষ উৎসাহ থাকা সত্তেও বাংগালী মেয়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়ে থাকে শারমীন এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি | অর্থাৎ, পড়াশুনা শেষ না হতেই বাবামায়ের ইচ্ছায় তাঁদেরই নির্ধারণ করা পাত্রের সাথে বিয়ের পীড়িতে বসতে হলো |

তারপর সংসার জীবন শুরু | দু’তিন বছরের মাথায় ঘর আলো করে সুমিষ্ট দু’কন্যার শুভাগমন | বাংগালী সমাজে সাধারনত বিয়ের পর মেয়েরা কিছুটা হলেও পরাধীন হয়ে পড়ে | সংসারের মায়াজালে আস্টেপৃষ্ঠে বন্দী হয়ে নিজ সপ্নের সমাধী আপন হাতে রচনা করতে বাধ্য হয় তারা | শারমীনও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে, ঐকান্তিক ইচ্ছা, মনের গোপন কুঠুরিতে কৈশরের লালিত সাধ আর স্বপ্ন তাকে অবিরত তাড়িত করতো কিছু একটা করার জন্যে | সেই তাড়নাই থেকেই মনের ইচ্ছাশক্তিকে দিনে দিনে আরো দৃঢ় করে তুলেছিল তিনি| শারমীন এর মা পুরনো ঢাকার মানুষ। মা আর নানীর কাছ থেকেই মূলত শারমীন এর রান্নার আমার হাতে খড়ি| মা আর নানী পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রান্না সহ খুব চমৎকার চমৎকার রান্না করতেন, যেগুলো দেখে দেখে রান্নার প্রতি মূলত শারমীন এর শখ ও আগ্রহ তৈরী হয়েছিল | দূর্নিবার ইচ্ছাশক্তি, সাধনা আর অধ্যবসায়ের ফলে শশুরবাড়ীতেও ক্রমেই রন্ধন পটিয়সী হিসেবে সুপরিচিত হতে থাকে। যা পরবর্তিতে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই একজন অভিজ্ঞ ও চৌকষ রন্ধন শীল্পি হিসেবে দ্রুত পরিচিতি লাভে সমর্থ করে তোলে তাকে |

ছোটবেলায় পঠিত -“ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয় “ মন্ত্রটি শারমীন এর জীবনে বড় রকমের এক পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে | শশুরবাড়ীতে একান্নবর্তী বিশাল জনসংখ্যার এক জনবহুল পরিবারে স্বামী, শশুর, শাশুরী , দেবর , ননদ, ভাসুর, জা – সকলের সেবা আর যত্নআত্তী করার পর নিজ সন্তানের দেখভাল করার সময়ই বলতে গেলে পেতনা তিনি | এই সব দায়িত্ব পালনের পর কদাচিৎ যে স্বল্প সময় টুকু পেতেন, জান প্রাণ দিয়ে সেই সময় নামক অমূল্য সম্পদটাকে কাজে লাগাবার প্রয়াস চেষ্টা করতেন | নিজ শখের কদর তথা চর্চা করার চেস্টা করেছেন | চাচা শশুর, ফুফু শাশুরী সমস্বরে বলতেন “বৌমা আসলেই বনেদী ঘরের মেয়ে, ভীষণ গুনী মেয়ে ”। বিড় বিড় করে সেদিন নিজেকেই নিজে বলেছিলেন,”জয়তু শারমিন জয়তু” “আমরা করবো জয়, আমরা করবো জয় একদিন, ওহো বুকের গভীরে আমরা জেনেছি আমরা করবো জয় একদিন |”

২০১৯ সালে রমজান মাসে হঠাৎ করেই ঘটলো দূর্ঘটনাটা বিবাহ-বিচ্ছেদ | জীবনের নতুন সংগ্রাম শুরু | জীবন যেখানে জয়নুল আবেদীনের আঁকা ছবির মতো হাঁটু কাঁদায় গেথে যাওয়া গরু গাড়ীর চাকার মতো, সেখানে তার মতো ক্ষুদ্র, নগন্য এক শারমিনের রন্ধন শিল্প বা সূঁচীশিল্প কতটাই বা আর সেই চিত্রকর্মের গাড়ীয়াল ভাইয়ের দম বের হওয়া, ঘর্মাক্ত দেহে ওষ্ঠাগত প্রাণে এক মেয়ের জীবনকে “ঠেলার” কাজ করবে ? তবুও এগোয় জীবন , থেমে থাকেনা তার | শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায় | দু’কন্যাসহ স্বামী পরিত্যাগ কারীনি শারমিন তবুও দমেনা | বিবাহিত জীবনে যেই শারমিন রাজবন্দী কয়েদীর মতো লেটেস্ট মডেলের টয়োটা করোলায় করে শুধু স্বামী বাড়ী থেকে পিত্রালয়ে, বড়জোড় ঈদেপার্বনে মার্কেটে, আর প্রত্যেক দিন দু’কন্যাকে স্কুলে আনা নেয়ার জন্যে শিক্ষিত বুয়া-কাম- স্ত্রীর কাজেই ব্যস্ত সময় পার করতো, সেই শারমিন এখন স্বামী ফেরত কন্যা হয়ে পিতামাতার সেবা করে দু’কন্যাকে লালন পালন করত; নিজ পায়ে দাঁড়ানোর কাজে স্বেচ্ছা-নিয়োজিত | শারমিন এখন বাস রিক্সা, বা সি, এন, জিতে করে একা পথ চলতে সক্ষম | শুধু তাই নয়,সেই সহজ সরল শারমিন ইসলামকে পাঁচ তারকা হোটেলের স্টাফ কার দিয়ে এখন পিক এন্ড ড্রপও করে যায় | শারমীন এখন একা পথ চলতে শিখেছে, স্বপ্নের আকাশ ছোঁবেই সে একদিন | চারপাশ থেকে নেতিবাচক প্রস্তাবে জীবন যখন দূর্বিসহ, সংসার জীবন যখন মৃত প্রায়, স্বপ্ন যখন মুখ থুবরে পড়েছে ঠিক তখনই সকলের প্রিয় হয়ে ওঠে শারমীন। শেফ কুলের সর্বজন শ্রদ্ধেয় টনি খান তাকে পরামর্শ দেন উদ্যোক্তা হওয়ার, স্বপ্ন দেখান নিজ পায়ে দাঁড়ানোর , নিজে কিছু করার | টনি খানের পরামর্শকে উপজীব্য করে রান্নার নেশাটাকেই পেশা হিসেবে নেন শারমীন।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে “বিসমিল্লাহ্ কিচেন” নামে একটি হোম কিচেন বিজনেস শুরু করেন। যার মাধ্যমে স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস কাচারীতে এবং পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ক্যাটারিং অর্ডার নিয়ে নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ করে আসছেন | বিভিন্ন স্কুলের বাৎসরিক মেলায় নিজস্ব স্টল নেন | এছাড়াও আমি ২০২০ ইং সালের শুরুতে “অনন্যা কনটেস্টে” সারা দেশের ৪০০ জন প্রতিযোগীর মধ্যে সেরা ৯ স্থান অর্জন করেন | শেফ কোর্সে ভর্তির পর , হোটেল লা-মেরিডিয়ানে অন কল চাকরির পর আর “অনন্যা কনটেস্টে” সারা দেশে ৪০০ জনের মধ্যে মাত্র ৯ স্থান অর্জন করার পর কাজের উৎসাহ বেড়ে যায় | স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নটা পায় মজবুত ভিত্তি | জীবন খুঁজে পায় তার গন্তব্যের দিশা | শারমিন পায় পান্জেরীর সন্ধান | টনি খানের হাতে কলমে দেয়া শিক্ষা আর নিজের গড়া ক্যাটারিং হাউজ (বিসমিল্লাহ কিচেন) এর বাস্তব অভিজ্ঞতা শারমিন এর জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নের গাড়িতে ডানা যোগ করে জীবনের নীল অন্তরীক্ষে মুক্ত বিহংগের মতো বীরদর্পে উড়তে শিখিয়েছেন | পেয়েছেন সাহস , কুড়িয়েছেন প্রেরণা | ‘ভয়’ কে করেছেন জয়, ‘না’ কে করেছন ‘হ্যা’ | প্রচন্ড ঘাত প্রতিঘাত খেয়ে , বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, আনন্দের আতিশয্যে , বাঁধভাঙা আবেগের মোহনায় দাঁড়িয়ে আজ শারমিন এর কাছে মনে হয়, তিনি যেন জীবন যুদ্ধে মূর্তিমান এক বিজয়ী “ফীল্ড মার্শাল ।”

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ শারমীন ইসলাম এর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে শারমীনের যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। শারমীন এর এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।