পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা রুবী

0
124

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, পর্যটন প্রশিক্ষক, গবেষক এবং পর্যটন উদ্যোক্তা জোহরা আকবর রুবীর পথচলার গল্প।

রুবী ০৫ই জানুয়ারি ১৯৬৪ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম একজন সরকারী কর্মকর্তা ও মা বেগম হাজেরা ইসলাম একজন সুগৃহিনী ছিলেন। স্বামী একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। তিনি দু’ছেলের জননী। বাবার চাকরির সুবাদে জন্মলগ্ন থেকেই ঢাকায় আজিমপুর অফিসার কোয়ার্টারে তার শৈশব-কৈশোর-যৌবন কাটে। আজিমপুরের “অগ্রনী বালিকা বিদ্যালয়” থেকেই এসএসসি, চট্রগ্রাম সরকারী মহিলা মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি এবং চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে ঢাকা মিরপুর ডিওএইচএস-এ স্বামীসহ বসবাস করছেন।

পরিবারের কারনে ছোট বেলা থেকে পড়া-লেখা, খেলা-ধুলা, গান বাজনার মাঝে থেকেও রান্নার প্রতি তখন থেকেই তিনি ছিলেন আগ্রহী । এভাবে বাবা-মা আর নিজের সংসারে কিছু রান্না কোন কোন সময় এমন হতো যে, প্রথম বারেই ছক্কা পড়ে যেত। সবাই খেয়ে প্রসংশা করতেন আর বলতেন, রান্নায় ‘হাতে যশ’ আছে ভাল। তাদের সেই আন্তরিকতা আজও প্রেরণা যোগায়। একমাত্র বড় বোন ছিলেন “হোম ইকনোমিক্সের’ ছাত্রী তার অনুপ্রেরণায় প্রতি দিনই রান্না নিয়ে চলতো গবেষনা। এতে করে রান্নায় আরও অনেক কিছু জানতে পারেন এবং উৎসাহিত হন। বোনের সাথে সাথে সে সময় থেকেই শ্রদ্ধেয়া মরহুমা অধ্যাপিকা “সিদ্দিকা কবীর” এর ভক্ত হয়ে যান এবং নিজের জীবনে ‘আইডল’ এর আসনে উনাকে অধিষ্ঠিত করেন। এভাবেই তিনি রান্নার জগৎ-এ এগোতে থাকেন।

রুবী, ১৯৮৩ সালে বিয়ের পর স্বামীর চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ান এবং দেশীয় রান্নায় এক বিরাট অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। স্বামীর চাকরির স্থলে Foreign Deligation এর মাধ্যমে অনেক রান্নার রেসিপি সংগ্রহ করেন। তবে রান্নার মধ্যে বেকিং এর প্রতি তার অদম্য আগ্রহ। স্বামীর পক্ষে সে সময় সংসার জীবনের শুরুতে শখ হলেও স্ত্রীকে ওভেন কিনে দেবার মত সাধ্য ছিল না। পরবর্তীতে এর চেয়েও অত্যাধুনিক ওভেন তার স্বামী তাকে বিদেশ থেকে এনে দেন। সেই থেকে কেক-বিস্কুট-প্যাটিস বানানো পালাক্রমে চলতে থাকলো আনন্দের সাথে এবং শুরু হলো পছন্দের বেকিং- এর যাত্রা। সংসারের প্রতিটা অনুষ্ঠানে রান্নার সাথে সাথে বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্মবার্ষিকী-ম্যারেজ ইউনির্ভাসারিতে তিনি নিজেই কেক তৈরি করে ডেকোরেশন করতেন। স্বামীর বদলীর কারনে দেশে মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেকিং এর ভাল খাবার পাওয়া যেত না। তখন তাই তিনি নিজেই সে সব ঘরে তৈরি করতেন। সেনানিবাসে থাকাকালীন সেনানিবাসের ‘লেডিস ক্লাব’ ও ‘সমিতি’ পরিচালনার দায়িত্বে থেকেছেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেমনি উপস্থাপনা-গানও করেছেন, তেমনি সেনা পরিবাববর্গদের রান্নাও শিখিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের কোর্স করেন। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো ২০০২ সালে ‘পর্যটন করপোরেশন এর ন্যাশনাল ট্যুরিজম অরগ্যানাইজেশন’ থেকে “বেকারি এন্ড পেষ্ট্রি” কোর্সে সফলতার সাথে “ক্রেডিট” পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং ঢাকার পাঁচতারকা হোটেল “প্যান প্যাসেফিক সোনারগাঁও”-এর “বেকারি এন্ড পেষ্ট্রি” ডিপার্টমেন্ট থেকে ইন্টার্নি করে সার্টিফিকেট অর্জন করেন। এছাড়া NHTTI তে সে বছর ”Ladies Cookery” কোর্স সম্পন্ন করেন।

রুবীর স্বামীও অত্যন্ত সৌখিন ও ভোজন রসিক। সুতরা শ্বশুর বাড়ি ও বাপের বাড়ি দুইয়ে দুইয়ে তাই চার হয়ে গেল। সকলের প্রেরনায় দিন দিন রান্না-বেকিং দু’টোতেই তিনি আরও পটিয়সী হয়ে উঠেন। এভাবে রান্নাটা সংসার জীবন থেকে তার জীবনে “শিল্পে” পরিনত হলো। স্বামী, ছেলে সকলের উৎসাহে তাই প্রথম “সেরা রাঁধুনী” বাংলা ১৪১৪ (২০০৮ইং)-তে অংশগ্রহন করেন এবং “সেরা রাঁধুনী” বাংলা ১৪১৪(২০০৮ইং)-তে তিনি “ প্রথম রানার আপ” এ পুরস্কৃত হন। এরপর চলার পথ আরও সুদুর হতে সুদুরে যেতে থাকলো এছাড়াও আরও রান্না প্রতিযোগিতায় তিনি অংশগ্রহণ করে পুরস্কৃত হন। ২০০৩-২০০৪ সালে “চ্যানেল আই-এর ‘তারকাকথন’ এর ২য় পর্ব ‘ভাবীর রেসিপি’-তে এককভাবে রান্নার অনুষ্ঠানে রান্না শেখান।

২০১০ সালে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের জি বাংলায়, জি- রান্নাঘর-এ সুদীপার উপস্থাপনায় নিজ দেশের রান্না প্রদর্শন করে যেমন সুখ্যাতি অর্জন করেন তেমনি সপ্তাহ ও মাসের সেরা রান্নায় ভুষিত ও পুরস্কৃত হন। দেশের অন্যান্য টিভি চ্যানেলেও রান্নার অনুষ্ঠানে রান্না শেখান। দেশের সুনামধন্য বিশিষ্ট রন্ধনশিল্পী শ্রদ্ধেয়া কেকা ফেরদৌসির “দেশ বিদেশের রান্না” অনুষ্ঠানের জন্য তার সাথে সাথে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান ও রান্না প্রদর্শনে অংশ নেন। তিনি “কুকিং এ্যাসোসিয়েশন” এর একজন সদস্যা। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি রান্না শেখানো, রান্নার প্রতিযোগিতায় বিচারক হওয়া ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গরীব অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে বিনামূল্যে রান্না শিখিয়ে তাদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করে থাকেন।

তিনি একজন ভ্রমন পিপাসু। সুযোগ পেলেই স্বামীসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমনে বেড়িয়ে পড়েন। এ পর্যন্ত ২৫-৩০ টি দেশ ভ্রমন করেছেন। এর মধ্যে ভারত, চীন, আফ্রিকার বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্য দেখার সৌভাগ্যও তাঁর হয়েছে। এতে করে তিনি বিভিন্ন দেশের রান্নায় আরো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। মাঝে মাঝে আত্বীয় স্বজনদের সামনে তার সেই সঞ্চয় গুলির বর্হিঃপ্রকাশ ঘটান এবং সমাদৃত হন। এ সময় তিনি ঘর থেকেই ক্যাটারিং এর কাজও করেন। স্বামী চাকরিতে অবসর নেবার পর ২০১১ সালে মিরপুর ডিওএইসএস এ বাড়ী তৈরির কাজে হাত দেন। এ সময় তার শ্বশুর বাবা তাকে প্রচুর উৎসাহ প্রদান করেন তার দোয়ায় এবং স্বামীর সহযোগিতায় পরবর্তীতে নূতন করে বড় পরিসরে বাড়ীরসম্পূর্ন গ্রাউন্ড ফ্লোরটিতে কাজ শুরু করলেন। মরহুমা বড় বোন ‘আমিনা’ এর জন্মবার্ষিকী স্মরণে ৩১’শে ডিসেম্বর ২০১২ সালে ‘ক্রিসপি এন্ড ক্রাঞ্চি (সি এন সি)’ নামক ফাষ্টফুড রেষ্টুরেন্ট চালু করেন। সে থেকে এই রেষ্টুরেন্ট নিয়েই পথ চলা।

এরপর ছোট পরিসরে শুধু রেষ্টুরেন্টের চাহিদা মেটাতে ‘বেকারী’ শুরু করে পাউরুটি, বন, সাব বন তৈরি করতে থাকেন। তাছাড়া রান্নায় সুখ্যাতি ও এলাকাবাসীর স্বার্থে তাকে বড় পরিসরে ’’Ruby’s Cooking centre’’ চালু করেন। ফলে আরও দুটি ওভেন চায়না থেকে আমদানী করেন। বর্তমানে এলাকার চাহিদা পুরনের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়। এছাড়া বন-বিস্কুট, পেষ্ট্রি-পুডিং ইত্যাদিও তৈরি করে থাকেন। রমজান মাসে চলে ‘দই বড়া’। এভাবেই একটু একটু এগোতে থাকেন কিন্তু ভয়াল করোনার কারনে প্রতিষ্ঠান দুটি আপাতত বন্ধ আছে। পরিস্থিতির উপর পুনরায় চালু করা নির্ভর করছে। এছাড়া নিজ ঘরেই বিভিন্ন ধরনের রান্না, পেষ্ট্রি এন্ড বেকারী, কেক ও কেক ডেকোরেশন ক্লাস পরিচালনা করছেন অতীব দক্ষতার সাথে, যা ’’Ruby’s Cooking centre’’ নামে পরিচিত। মিরপুর UCEP থেকে তিনি NTVQF এর Level-2 Bakery ও Level-4 Assessor কোর্স সম্পন্ন করে এর নিবন্ধনকৃত একজন Assessor হন।

তার প্রকাশিত বইঃ
“সেরা রাঁধুনীর রান্নাঃ দেশীয় রান্নাঃ ২০১৪ সালে
“সেরা রাঁধুনীর রান্নাঃ শুটকী রান্নাঃ ২০১৫ সালে
“সেরা রাঁধুনীর রান্নাঃ চাইনিজ রান্নাঃ ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়।
তার রচিত বই গুলি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাদৃত হয়েছে।
বাংলাদেশে শুটকীর বৃহত্তর পাইকারী বাজার হলো বন্দর নগর চট্রগ্রামের “আসাদ গঞ্জ” শুটকী পট্রি। এখানে প্রায় ৪০০ শুটকীর দোকান আছে। তার মধ্যে “মেসার্স নূর এন্ড সন্স” দোকানটি অন্যতম। ফেসবুকে “শুটকী বাজার (shutki bazar)” নামে এদের একটি পেইজ আছে। প্রতি সপ্তাহে এই “শুটকী বাজার” জোহরা আকবর রুবী” এর “সেরা রাঁধুনীর রান্না”-শুটকী রান্না বই থেকে একটি করে শুটকী রান্নার রেসিপি প্রকাশ করে থাকেন।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ জোহরা আকবর রুবীর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে রুবীর যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। রুবীর এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।