পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা মেহেরুন

0
634

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, পর্যটন প্রশিক্ষক, গবেষক এবং পর্যটন উদ্যোক্তা মেহেরুন নেসার পথচলার গল্প।

বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত রাজশাহী জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যম্পাসে ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহন করেন। জন্মের পর বাবার চাকুরির সুবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে বেড়ে উঠা। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর জিল্লুর রহিম, রসায়ন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং টিচার এসোসিয়েশনের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন।১৯৭৪ সালে পি. এন. গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন এবং ১৯৭৬ সালে রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালে অনার্স ও ১৯৮২ সালে মাস্টার্স পাস করেন।

মেহেরুন নেসা গৃহিনী থেকে রন্ধন শিল্পী, রন্ধনবীদ, সমাজসেবী ও সংগঠক। মেহেরুন নেসার মায়ের রান্না খেয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী প্রফেসর শামসুল হক যথেষ্ঠ প্রশংসা করেন এবং একটি রান্নার বই লিখতে অনুরোধ করেন।মায়ের স্বপ্ন পূরন করেছেন মেহেরুন নেসা রান্নার বই “মেহেরুনের রকমারি রান্না” প্রকাশ করে। তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ১৯৭৯ সালে, স্বামী টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার হাফিজুর রহমান। মেহেরুন এর যখন বিয়ে হয় তখন তিনি সমাজ বিজ্ঞানে (অনার্স)এ অধ্যায়নরত। বর্তমানে তিন ছেলে ও এক মেয়ের জননী তিনি।

১৯৬৮ সাল থেকে বাংলাদেশ গার্লস গাইড এসোসিয়েশনের সদস্য। ১৯৭৮ সালে সেরা গাইড পদক পান তিনি। ১৯৭৮ সালের ব্যাংককে প্রথম এশিয়া প্যাসেফিক রিজিওনাল সেমিনারে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র রেঞ্জার (সিনিয়ার গ্রুপের নাম) হিসাবে অংশ গ্রহন করার সুযোগ পান। থাইল্যান্ডের বিভিন্ন পর্যটন এলাকা ঘুরে দেখতে পান যে সেখানে গরীব মেয়েদের ট্রেনিং দিয়ে আত্মনির্ভরশীল করে তৈরী করা হচ্ছে। তখন থেকে মেহেরুন এর রান্না এবং পর্যটন বিষয়ে আগ্রহ জেগে উঠে। তার বাবা ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে পিএইচডি করতে যান এবং ১৯৭০ সালে ফিরে আসেন। বিদেশ থেকে বাবার সঙ্গে আনা বেকিং ও কুকিং এর উপর বই গুলো তিনি সবসময় পড়তেন এবং চেষ্টা করতেন সেভাবে রান্না করতে ও খবার সাজাতে। পরে তাদের আজিমপুরের বাসায় একজন ব্রিটিশ মহিলা তার রান্না খেয়ে অনেক প্রশংসা করেন এবং টিভি চ্যানেলে রান্না শেখাতে অনুপ্রাণিত করেন যাতে করে অনেক মানুষ উপকৃত হয়।

এটিএন বাংলা টিভি চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিয়ে ২০০৫ সালে জানুয়ারীতে কাচ্চিবিরিয়ানী রান্না দেখিয়ে বেশ সুনাম অর্জন করেন। পরবর্তীতে একটানা ১২ বছর “এটিএন রান্না ঘর” নামে রান্না বিষয়ক অনুষ্ঠান ২০১৭ সাল পর্যন্ত করেন। বর্তমানে “SAMSUNG SMART KITCHEN” নামে একটি রান্নার অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাকারী এবং রন্ধনশিল্পী। এছাড়াও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে রান্না শিখিয়ে যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেন। ২০১৩ সালে রন্ধন শিল্পীদের নিয়ে “কুকিং এসোসিয়েশন” নামে একটি সংগঠন তৈরী করেন। সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের আঞ্চলিক খাবার সমূহ সবার সামনে তুলে ধরা এবং গরিব মেয়েদের ফ্রি রান্না শিখিয়ে আত্মনির্ভরশীল হিসাবে গড়ে তোলা। সংগঠনের শ্লোগান হলো “রান্না শিখুন এবং আত্ম-নির্ভরশীল হন”। সেই প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত ১২০ জন নারী রান্না শিখে নতুন উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ গার্ল গাইড এসোসিয়েশন, বেলী রোড অফিসে রান্না কোর্সে বেকিং ও কুকিং স্কুল পরিচালনা ও পরিকল্পনা করেন। মেহেরুন কুকিং স্কুল ও কুকিং এসোসিয়েশন এর কুকিং ও বেকিং এর শিক্ষক হিসাবে এখনও কাজ করছেন। কুকিং এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদিকা হিসাবে তিনি বাংলাদেশে প্রথম মোগলাই, চাইনিজ, থাই, বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের খাবার, বেকিং ও ডেজার্ট এর কোর্স শুরু করেন। শ্রেষ্ঠ রন্ধনশিল্পী হিসাবে বাবিসাস এওয়ার্ড অর্জন করেন। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে কেকা ফেরদৌসির ২৫ বছর টিভি রান্নার বর্ষপূর্তিতে জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পী পুরষ্কার পান। তাছাড়া জি-বাংলা রান্না ঘরে রান্নার অনুষ্ঠান করে সেরাদের সেরাতে বাংলাদেশ থেকে তিনি ২য় স্থান অধিকার করেন। এটিএন রান্না ঘর অনুষ্ঠানে ৩০০ পর্বে এটিএন রন্ধনশিল্পী সম্মাননা পুরষ্কার পান। ২০০৬ সাল থেকে আনন্দ ভুবন পত্রিকায় তার প্রায় ১৩০০টি রেসিপি প্রকাশিত হয়েছে। এই রেসিপি গুলোর মাধ্যমে অনেকে উপকৃত হয়েছে। অধিকন্তু বাংলাদেশে ৬৪ জেলার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের হেরিটেজ খাদ্যের ১৪৫টি রেসিপি উদ্ধার করেছেন।

সামাজিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে মেহেরুন নারী ও শিশু উন্নয়ন পরিষদ, লালবাগ এর সভাপতি ছিলেন। জাতীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাথলেটিক্স সাব কমিটির সদস্য ছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে মহিলা কমিটির রান্না ও পিঠা প্রতিযোগীতায় কনভেনার হিসাবে বই পড়া, কবিতা আবৃতি, ছোট গল্প লেখা, ভ্রমন, সেলাই এবং নতুন নতুন বাংলা রেসিপি তৈরী করা কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার , ভারত, সিঙ্গাপুর সহ প্রায় ২০টির মত দেশ ভ্রমন করার সুযোগ হয়েছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের খাবারের রেসিপি সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চার্যের নিদর্শন গুলোর মধ্যে পাঁচটি নিদর্শন দেখারও সৌভাগ্য হয়েছে তার।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ মেহেরুন নেসার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে তমার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে।মেহেরুন এর এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।