পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা সেতু ।

0
529

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী, পর্যটন প্রশিক্ষক এবং পর্যটন উদ্যোক্তা আঞ্জুমান সরকার সেতুর পথচলার গল্প।

সেতু ১৯৭৫ সালের ঢাকার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। বাবা খালেক সরকার ছিলেন ঢাকার ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। ছোট বেলা থেকে ঢাকার ধানমন্ডিতে বেড়ে উঠেছেন। শিক্ষা জীবন আরম্ভ হয় তৎকালীন কাকলি উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি আজিমপুর স্কুল এন্ড কলেজ থেকে ১৯৯০ সালে এসএসসি পাস করেন এবং বেগম বদরুন্নেসা মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে ১৯৯৮ সালে অনার্স ও ২০০০ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পরে অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। পরে অনেক চড়াই উতরাই পাড়ি দিয়ে মাস্টার্স সম্পূর্ণ করেন। মা,স্বামী আর দুই ছেলে নিয়ে তার জীবন সংসার। বড় ছেলে সানজিদ হাসান মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে লেখাপড়া করছে এবং ছোট ছেলে আদিয়াত হাসান রাজধানীর স্কলাস্টিকা স্কুলে ১০ম শ্রেনীতে পড়ছে।

সেতু জিওগ্রাফি বিভাগ থেকে অনার্স-মাষ্টার্স শেষ করার পরে বন্ধুরা যখন বিসিএস বা বড় বড় চাকরির পিছনে দৌড়াচ্ছিল ঠিক তখনই নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করার কথা ভাবেন। স্বামী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা। স্বামীর চাকুরীর সুবাদে সারা দেশে ঘুরে বেড়াতে হতো সেতুকে। তাছাড়া ছোট বেলা থেকে পরিবারে রান্নার ধুম লেগে থাকত। বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার খেতে খেতে একসময় নিজের মধ্যেও নানা খাবারের আয়োজনের পসরা সাজিয়ে একে একে রান্নার শখটিকে নিজের পেশা হিসাবে বেছে নেন তিনি। পেশা হিসেবে রন্ধনশিল্পকে অধিক সমৃদ্ধ করার নিমিত্তে সেতু নিজেকে প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সে অনুযায়ী বাংলাদেশ কারগরি শিক্ষা বোর্ডের অধিনে ফুড ও বেভারেজ সম্পৃক্ত লেভেল ৪ পর্যন্ত কোর্সগুলি সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশ নারী ও শিশু অধিদপ্তর থেকে ফুড প্রসেসিং কোর্স এবং বাংলাদেশ কুকিং এসোসিয়েশন থেকে ফ্রোজেন ফুড প্রসেসিং কোর্স করেন। তিনি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একজন তালিকাভুক্ত এসেসর। তিনি প্রাণ স্পাইস এর এডভাইজার হিসাবে কাজ করছেন এবং আইপিডিসি’র ব্রান্ড এম্বাসেডর ছিলেন । তিনি রান্নার প্রশিক্ষক হিসাবে ও কাজ করেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন ফুড কোম্পানি ও স্যামসাং ইলেক্ট্রনিক এর কুকিং এক্সপার্ট হিসাবে কাজ করেন।

গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশ এবং কোলকাতায় সুনামের সাথে রন্ধনশিল্পী হিসাবে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে কাজ করে আসছেন তিনি। রন্ধনশিল্পের পাশাপাশি তিনি একজন ইনটেরিওর ডিজাইনার। আঁলিওস ফ্রাসোয়া থেকে তিনি ইনটেরিওর ডিজাইনিং এ ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন এবং এটিএন বাংলার গৃহ সজ্জা বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘চার দেওয়ালের কাব্য’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি টেলিভিশন জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব জারনালিসম এন্ড ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া হতে নিউজ প্রেজেন্টার কোর্স সম্পন্ন করেন।

পেশাগত জীবনে তিনি দৈনিক যুগান্তরে একাধারে ১০ বৎসরের অধিক রেসিপি রাইটার হিসেবে নিয়োজিত আছেন। সেতুর রেসিপি থাকে বাংলাদেশের আনন্দ আলো, প্রথম আলো, আমাদের সময়, মানবকন্ঠ, স্বাদকাহন এবং ক্যানভাস সহ অনেক দৈনিক/সাপ্তাহিক পত্রিকায়। সেতুর রেসিপি সমুহ বাংলাদেশের বাইরে কোলকাতার হ্যাংলা হেশেল, সানন্দা এবং সংবাদ প্রতিদিন প্রকাশিত হয়। এই উপ মহাদেশের বাইরেও অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাংলা পত্রিকা ঠিকানাতে সেতুর রেসিপি প্রকাশিত হয়। এই গুণী শিল্পী কোলকাতার হ্যাংলা হেঁশেল পত্রিকার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কোলকাতায় সরাসরি অন লাইনে রন্ধন বিষয়ক ক্লাশ নিয়ে থাকেন। তিনি রান্না নিয়ে দেশের সকল টেলিভিশনে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি কোলকাতার স্বনামধন্য টিভি চ্যানেল জি-বাংলা টিভিতে জি-বাংলার রান্না ঘর এবং আর্টেজ নিউজ চ্যানেলে রান্না বিষয়ক কাজ করেছেন। প্রান গ্রুপের ‘দি সেফ ম্যাকারনি রান্না প্রতিযোগিতা’য় সারা বাংলাদেশে প্রধান বিচারক হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়াও ড্যান কেক ডেজার্ট প্রতিযোগিতার আঞ্চলিক বিচারক ছিলেন।

সেতু বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার স্থির চিত্রের মডেল হয়েছেন। তিনি ইউএনডিপি ও ইউএসএআইডি’র প্রজেক্ট যাহা ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও গৃহ সুখন এর সাথে প্রজেক্ট ট্রেইনার হিসাবে ঢাকার প্রায় ২০০ বস্তিবাসী নারীকে বস্তীতে যেয়ে স্ট্রীট ফুডের উপর প্রশিক্ষিত করে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেন। সেতু বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন অঞ্চলের পিঠা নিয়েও কাজ করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন গায়ে হলুদ, বিয়ে, কর্পোরেট অনুষ্ঠান, জন্মদিন , অতিথি আপ্যায়ন এর জন্য পিঠার অর্ডার নেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন পিঠা মেলাও করে থাকেন। শুধু রন্ধনশিল্পীতে থেমে নেই তিনি, নারী উদ্যোক্তা হিসাবেও নিজেকে মেলে ধরার চেষ্ঠা করছেন। রান্না করা যেহেতু পেশা, সেহেতু মানুষকে মজার মজার খাবার উপহার দিতে ভুলেন নি। তাই রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় ২০১৭ সালে গড়ে তুলেছেন সেতু’স কিচেন নামের একটি আধুনিক রেস্টুরেন্ট। এ ছাড়া তিনি ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত সেনাকুঞ্জ এবং সেনা মালঞ্চে অনেক বড় পরিসরে বুশরা এন্টারপ্রাইজ নামে ফুড ক্যাটারিং করেন ।

সেতু দেশে ও বিদেশে রন্ধন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে একাধিক সম্মাননা / পুরষ্কার অর্জন করেছেন। বাবিসাস অ্যাওয়াড ২০১৭-১৮, ইনডেক্স মিডিয়া স্টার অ্যাওয়াড সহ আরো অন্যান্য স্বীকৃতি রয়েছে। সেতু বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত। তিনি মহিলাদের উন্নয়নের জন্য গঠিত সংগঠন ‘পাওয়ার অবশী এর এডভাইজার হিসেবে কাজ করছেন।সেতু বাংলাদেশ কুকিং এসোসিয়েশনের একজন ফাউন্ডিং সদস্য এবং সংগঠনের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলাদেশের খাবারকে বিশেষ করে আঞ্চলিক খাবার ও ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলিকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করার ইচ্ছে জানান তিনি। বাংলাদেশী খাবার যেন আন্তর্জাতিক ভাবে মর্যাদা পায় এবং তাদের হোটেল ও রেস্টুরেন্ট/ ফুডকোট সমুহের মেনু কার্ডে স্থান পায় সে বিষয়ে কাজ করে যেতে চান তিনি। সেতুর সেতু’স কিচেন নামে একটি ইউ টিউব চ্যানেল রয়েছে।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ আঞ্জুমান সরকার সেতুর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে তমার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। সেতুর এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।