পর্যটনের আরেকদফা ভরাডুবি (!) : মোখলেছুর রহমান

0
86

বাংলাদেশের পর্যটনের আরেক দফা ভরাডুবি হলো গত ২৩ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার। বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম’ চালু করলো ক্ষুদ্র ঋণের জন্য। কিন্তু উপখাত নির্ধারণের বিষয়টি অমীমাংসিত থাকার জন্য এবারও পর্যটনকে এই স্কীমের বাইরে রাখা হলো। বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে পর্যটনের উপখাত ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের আওতা সম্বন্ধে জানতে পারার জন্য এই ধরণের ভরাডুবি অব্যাহত আছে। অর্থাৎ পর্যটন শিল্পঋণ পাবে না, এসএমই ঋণ পাবে না এবং এবার ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমেরও বাইরে থাকলো।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশটি স্বাধীন হওয়ার দিন থেকেই এদেশে পর্যটন বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় আছে, যেখানে বছরের পর পর বছর ধরে বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন হাজার হাজার শিক্ষিত, পেশাদার ও অভিজ্ঞ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারি। তাতে করে এই সেক্টরের অর্থনৈতিক, নীতিগত, বুদ্ধিবৃত্তিগত ও পেশাগত কী উন্নতি হয়েছে আমার কাছে কোনভাবেই কিছুই দৃশ্যমান হয় না। তাই যদি হতো তাহলে স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর এসে কেন আমাদেরকে শুনতে হচ্ছে এর কোন উপখাত নির্ধারিত হয়নি। আরো মজার বিষয় হলো, পর্যটন এখনো বাংলাদেশের সরকারের কাছে শিল্পই নয়। এখনো একে শিল্প ঘোষণা করা হয়নি। অথচ অন্যদিকে ১৯৯৯ সালের শিল্পনীতিতে অগ্রাধিকারভূক্ত খাতের তালিকার আওতাভূক্ত করা হয়েছে। এর যে কী অর্থ, এ থেকে কী উপকার পাওয়া তাও আমাদেরকে কেউ বুঝাতে পারেননি।

পর্যটন কী আসলে? এর কোন উত্তর নাই! বাংলাদেশের কোন সরকারি নথি, সরকারি আদেশ, সরকারি সিদ্ধান্ত থেকে রেফারেন্স হিসেবে বের করে কেউ এর উত্তর দিতে পারবেন না। যার জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব জাবেদ আহমেদ কিছুদিন আগে টোয়াবের সাথে এক জুম মিটিংয়ে যথার্থই বলেছিলেন যে, আপনারা স্বত্ত্বা সংকটে (Identity Crisis) ভুগছেন। এর অর্থ হলো পর্যটন না সেবা, না শিল্প, না ব্যবসায়, না কোন উন্নয়ন কর্মকান্ড! কী বিচিত্র, তাই না। এর মন্ত্রী আছেন, মন্ত্রণালয় আছেন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড আছে, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন আছে এবং তাতে কর্মরত ডাকসাইটে আমলারাও আছেন। বছরের পর বছর ধরে প্রজাতন্ত্রের অর্থে প্রতিপালিত হচ্ছেন, নিজেদেরকে মর্যাদায়িত করছেন। অথচ পর্যটনের কোন স্বত্ত্বা নাই, পরিচিতি নাই, অস্তিত্ব নাই সরকারের খাতায়। আরো মজার ব্যাপার হলো এর জন্য কারো কোন লজ্জাও নাই।

উপখাত নির্ধারণের সর্বশেষ নাটকটি নিম্নরূপ: গত ৯ জুন ২০২০ তারিখে সম্মিলিত পর্যটন জোটের সাথে ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জনাব আবু ফারাহ মো. নাসের-এর ‘পর্যটন সহায়ক ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তন’ শীষক একটি অনলাইন সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব জাবেদ আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে এবং জনাব পারভেজ শাহরিয়ার, অর্থনীতিবিদ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভায় আটাব ও টোয়াবের নেতৃবৃন্দও আলোচনায় অংশ নেন। উক্ত সভায় আলোচনা ও সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ‘ট্যুরিজম এসএমই খাতে ঋণ প্রদানের গাইডলাইন প্রস্তুতি’-র জন্য ১৪ জুন ২০২০ তারিখে ১০ (দশ)টি উপখাতের অধীন শতাধিক বাণিজ্যিক পর্যটন কর্মকান্ড চিহ্নিত করে একটি প্রস্তাবনা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবরে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ১৫ জুন ২০২০ তারিখে ২ জন সরকারি কর্মকর্তা ও ২ জন বেসরকারি ব্যক্তি দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে এবং ১৮ জুন ২০২০ তারিখে ৬ লাইনের একটি সংক্ষিপ্ততম প্রস্তাবনা বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের প্রস্তুতি নেয়। বিষয়টি জানতে পেরে আমি সম্মিলিত পর্যটন জোটের আহবায়ক হিসেবে কঠোর মনোভাব পোষণ করি এবং সিইও, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড বরাবরে নিচের পত্রটি প্রেরণ করি।

‘জনাব … …,
আপনাদের ইমেইল থেকে আসা একটি সংযুক্ত খসড়া পত্র বিস্ময়ের সাথে অবলোকন করেছি যে, বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে নিচের ৬টি উপখাতে ভাগ করে নিম্নরূপে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এসএমই ঋণের গাইডলাইন তৈরি করার জন্য প্রেরণ করতে যাচ্ছেন।

  1. Food and Beverages (Restaurant, Coffee shop, Juice Bar, Bakery, Bar)
  2. Tourism Services (Tour Operator, Travel Agent, Hajj Agent, Community Based Tourism, Travel & Tourism Magazine Owner, Tourism Training Institute, Souvenir Shop)
  3. Accommodation/Lodging (Hotel, Motel, Resort, Boat House, Homestay, Lodge, Inn, Guest House, Cottage)
  4. Recreation (Amusement Park, Safari Park, Theme Park, Heritage Park, Parasailing, Snorkeling, Scuba Diving, Kayaking)
  5. Events and Conferences(International Fair, Event & Conference organizer)
  6. Transportation (Tourist Vessel, Tourist car, Cruise ship, Tourist Boat)

আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, গত ১৪ জুন ২০২০ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মহোদয় বরাবরে লিখিত পত্র (সূত্র: বিটিএফ/এসএমই/বিবি/১৪(৬)/২০২০ তারিখ: ১৪ জুন ২০০২ খ্রি:) যা আপনাদের মাধ্যমে প্রেরণের জন্য দাখিল করা হয়েছে, তাতে বিস্তারিতভাবে ১০টি উপখাতের অধীন অন্তত ১২৫টি বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের উল্লেখ রয়েছে। এই পত্র পেয়ে আপনি এতদ্বিষয়ে ১৫ জুন ২০২০ জনাব আবু তাহের মো. জাবের, পরিচালককে সভাপতি করে ৪ (চার) সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন এবং ২ (দুই) কর্মদিবসের মধ্যে সদস্যগণকে মত দিতে বলেন। আশা ছিল এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে পর্যটনের উপখাত ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম যে, তা অধিক সংকুচিত করে মন্ত্রণালয়ের পাঠানোর জন্য আপনারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর ফলে এই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত বর্তমান ও ভবিষ্যতের লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী আশাতীতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এহেন কৌশলে উপখাত ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডগুলির সংকোচনের ১০০% বিপক্ষে আমাদের অবস্থান। পর্যটন খাতকে এভাবে সংকুচিত করেন একে অকার্যকর করার এহেন পদক্ষেপ থেকে আপনাদেরকে বিরত থাকার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি। অন্যথায় পর্যটনের সার্বিক উন্নয়ন ও বিকাশের স্বার্থে আমাদেরকে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত ৪০ লক্ষ মানুষের কর্মকান্ডকে নিয়ে এই সিদ্ধান্ত সম্পুর্ণরূপে জনস্বার্থ পরিপন্থি।

এমতাবস্থায়, কোন অবস্থাতেই পর্যটন খাতের সংকোচনের সিদ্ধান্তকে আমরা গ্রহণ করবো না। এই শিল্পের সাথে আমাদের আগামী দিনের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আয় নির্ভর করছে। আশা করি, আপনাদের সকল সিদ্ধান্ত জনবান্ধব ও পর্যটনবান্ধব হবে।

আমাদের এই প্রতিক্রিয়া অনুধাবনের জন্য আপনাদেরতে অগ্রিম সাধুবাদ জানাচ্ছি।’

বর্ণিত পত্রের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ২৯ জুন ২০২০ তারিখে বোর্ডের ৫ (পাঁচ) জন বেসরকারি সদস্যদেরকে নিয়ে দ্বিতীয় উচ্চশক্তিশালী কমিটি গঠন করে এবং ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলে। এবার আমরা বুঝে যাই যে, বিলম্বিত করার কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে একে যাচাই, বাছাই, পরীক্ষা, নিরীক্ষা, ব্যবচ্ছেদ, অঙ্গচ্ছেদ ইত্যাদি নানা ধরণের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অবিলম্বে ২ জুলাই ২০২০ তারিখে উক্ত কমিটির সদস্য সম্মানিত সদস্যদের বরাবরে নিচের পত্রটি প্রেরণ করি।

‘শ্রদ্ধেয় জনাব … …,
আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন (বিটিএফ) বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে দীর্ঘ দেন-দরবার করে ২ নভেম্বর ২০০৯ তারিখে ট্যুরিজম খাতকে এসএমই ও পুনঃঅর্থাযোগ্য খাত হিসেবে ঘোষণা করায়। পরে ২০১৯ সালে তারা একে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে মর্যাদা দেয়। কিন্তু এর উপখাত ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত না করার জন্য পর্যটনে ঋণপ্রবাহ চালু করতে পারে না। ৯ মে ২০২০ তারিখে সম্মিলিত পর্যটন জোটের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে এক জুম মিটিংয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ট্যুরিজম এসএমই-তে ঋণদান গাইডলাইন’ প্রস্তুতের জন্য বিটিএফ-কে অনুরোধ জানায়। উক্ত মিটিংয়ে বিটিবির সিইও মহোদয় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন যে, আমাদের প্রস্তাব পেলে তিনি একদিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিবেন। তাই আমরা পর্যটনের বিষদ উপখাত ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমগুলি চিহ্নিত করে ১৪ জুন ২০২০ তারিখে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডে জমা দেই। অতপর বিটিবি ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে খাত সংকোচন করলে আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাই। তাই এবার আপনাদেরকে নিয়ে পুনরায় ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। সিইও মহোদয় একদিনের মধ্যে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা বললেও বাস্তবে আজ ১৮ দিন ধরে খাত সংকোচনের উদ্দেশ্যে তা ফেলে রেখেছেন, যা আপনাদেরকে দিয়ে বাস্তবায়ন করতে চান। আমরা গভীরভাবে বিষয়টি অবলোকন করছি। যদি কোন আমলাতান্ত্রিক কৌশলে খাত সংকোচন করে পর্যটনের একবিন্দু ক্ষতি করার চেষ্টা করা হয় তাহলে আমরা যে কোন আন্দোলনে যাবো। আশা করি আপনাদের এই কমিটি আমলাতন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে পর্যটনের বিপক্ষে কোন অবস্থান নিবেন না।’

আজ জানতে পারলাম যে, দ্বিতীয় কমিটির চেয়ারম্যান মহোদয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কাছে অদ্যাবধি তাদের রিপোর্ট জমা দেননি।

এই অবস্থার প্রেক্ষিতে হতাশা সংগত কারণেই গ্রাস করে। শুধু ভাবি, বাংলাদেশের পর্যটন কী এতই অস্পৃশ্য যে একে দেখার কেউ নাই! এদেশে কারি কারি ট্যুরিজমের নেতা আছেন, শিক্ষক প্রফেসর আছেন, মন্ত্রী, আমলা এমনকি প্রধানমন্ত্রীও আছেন। তাহলে কী পর্যটনের দেকভালের জন্য বিদেশ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভাড়া করে আনতে হবে? আমাদের কারুরই কী কোন দায়িত্ব নাই, লজ্জা নাই? এত বড় একটি কুলাঙ্গার জাতিতে পরিণত হয়েছি আমরা? আপন মনে ভাবি, নিজের গায়ে থুতু ছিটিয়ে, নাকখত দিয়ে কিংবা রক্ত দিয়েও যদি এ থেকে মুক্তি পাওয়া যেতো! কারণ রক্ত না দিয়ে অতীতে এই দেশে কোন মহৎ কর্মই যে হয় না।

জাতির বিবেকের কাছে, রাজনীতিবিদদের কাছে এমনকি সবচেয়ে ক্ষতিকর আমলাতন্ত্রের কাছে আমার জিজ্ঞাসা: পর্যটনের আর কত ভরাডুবি দেখলে আপনারা খুশি হবেন? না কি রক্ত চান? কীসে আপনাদের জেদ মরবে? যদি দয়া করে বলেন, তাহলে এ জাতি না হয় তাই করবে। কারণ আপনারাই এখন দন্ডমুন্ডের কর্তা। আর জনগণ আপনাদের প্রজা। জনগণের পেটে ভাত ও বাণিজ্যের সমৃদ্ধির জন্য যে কোন কিছুর বিনিময়ে আপনাদেরকে সন্তুষ্ট করতে চায়। আর যদি আমাদের কোন অনুরোধই কেউ না রাখেন, তাহলে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করুন। আপনাদের বাঁচার পক্ষে অনেক শিক্ষা আছে ওখানে।

লেখক আহ্বায়ক, সম্মিলিত পর্যটন জোট
সভাপতি, বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন।