সাতক্ষীরার পথে সুন্দরবন ; রোমাঞ্চকর যাত্রা

0
682

শীত শুরুর প্রারম্ভেই নানাবিধ প্যাকেজ অফারে ভেসে যায় ফেসবুক , তিন রাত দুই দিন জাহাজে করে পানি পথে সুন্দরবন ভ্রমণ । এই দেখে আমার মনে হলো সারাক্ষণ জলের ওপর ভেসে থাকলে জনমানুষের জীবন কাছ থেকে আর দেখা হবে না ।

অজানাই থেকে যাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নাম । তাই দিদ্ধান্ত নিলাম যতো সময়ি লাগুক সুন্দরবন যাব সড়কপথে । ঢাকা হেকে সাতক্ষীরা যাবার টিকিট কেটে নিলাম । পৌষের তীব্র শীত সকাল ,সূর্য তেমন তেতে ওঠেনি , নন এসি বাস থেমে থেমে চলছে । যাত্রিরা উঠছে আবার নামছে, কুয়াশা থাকাতে তেমন কোন তাড়া নেই ড্রাইভারের । দৌলদিয়া ঘাটে বাসের লম্বা শারিতে আটকে গেলাম ।

বাস থেকে বেশ কিছু যাত্রি নীচে নেমে হাঁটাহাঁটি করছে , মানিকগঞ্জ বোধ করি পার করে এসেছি , দুই ধারে যতোদূর চোখ যায় কেবল ক্ষেত আর ক্ষেত , জানালার গ্লাস খুলে দিতেই নরম রোদ এসে গা ছুঁয়ে দিল । দুপুর ১ টা বেজে গেছে , গাবতলি থেকে এখানে আসতেই তিন ঘন্টা । খুব চা’য়ের তেষ্টা পেয়েছে , কিন্তু ফেরিতে না ওঠা অব্দি সেটা আর পাওয়া যাচ্ছে না । তাই কেবল অপেক্ষা ।

প্রায় দু’ঘন্টা পর অপেক্ষার পালা শেষ হলো ,বাস উঠে গেল ফেরিতে । শীতের দুপুর , হালকা রোদ পোহাতে উঠে গেলাম ফেরির তিন তলায় । হাত মুখ ধুঁয়ে ধোঁয়া ওঠা চা পান করলাম , বিস্তৃত পদ্মার বুকে ছুটে চলেছে ছোট বড় জাহাজ , এ যেন এপ্রান্তের সাথে ওপ্রান্তের মেল বন্ধন ।

ফেরিতে সময় লাগলো মোটে আধ ঘন্টা ,পানি তেমন নেই তাই তেমন ঝামেলা হয়নি পাড়ে নামতে । আবার যাত্রা শুরু । যশোর ছাড়িয়ে যবার পর আশ্বস্ত হলাম সাতক্ষীরা পৌঁছতে আর বেশি দেরি নয় । সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সাতক্ষীরা নেমে একটি অটো নিয়ে সোজা টাইগার প্লাস হোটেলে , আগেই বুকিং ছিল তাই তেমন কোন অসুবিধা হয় নি । গরম জলে গোসল ছেড়ে কল দিলাম প্রাক্তন কলিকদের যাদের বাড়ি এই অঞ্চলে ।

সোনারগাঁ রেস্তোরায় দেখলাম বেশ ভিড় ,বড় রাস্তার ওপরে হওয়াতে অনেক যাত্রি –ড্রাইভার এখানে খেতে আসেন । রাতে আমি তেমন কিছু নিলাম না ,শুধু দু’টো রুটি , কিন্তু মাংসের ঝোলের ঝালেতা আর বেশি দূর এগুতে পারিনি । আমার কলিগ ফারুক আমাকে নিয়ে গেলেন ছানা সন্দেশ খাওয়াতে ; বেজায় ঝাল মুখে সন্দেস পুরেই পরিকল্পনা করে ফেললাম আগামীকাল সুন্দরবন কী করে যাব ।

সাতক্ষীরা থেকে সরাসরি বি আর টি সি ছাড়াও আরো অনেক বাস রয়েছে , কেও কেও খুলনার বাসে উঠে মুন্সিগঞ্জ নেমে পড়েন ।

খুব শীত ভেবে বোঝাই করে কাপড় নিয়ে এসেছিলাম , কিন্তু তেমন ঠান্ডাই পড়েনি সুন্দরবনে । ডিরেক্ট সার্ভিস বলে ২০০ টাকা নিয়ে হেল্পার আমাকে একটি লোকাল বাসে চড়িয়ে দিল , আগ থেকে না জেনে নিলে যা হয় । তিন তিন বার গাড়ি বদলিয়ে অবশেষে শ্যামনগর থানার মুন্সিগঞ্জ পৌঁছালাম ।

আমিতো ভেবেচিলাম যাত্রা বুঝি এখানেই শেষ নয় , মেঠো পথ ধরে অনেকদূর যেতে হবে সুন্দরবন দেখতে । কিন্তু ভ্যানে উঠে পাঁচ মিনিট এগুতেই পেয়ে গেলাম টাইগার পয়েন্ট , পাশেই কটকা সমুদ্র সৈকত ।

বাংলায় সুন্দরবন-এর আক্ষরিক অর্থ সুন্দর জঙ্গল বা সুন্দর বনভূমি। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে , যা এখানে প্রচুর জন্মায়। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে , এর নামকরণ হয়তো হয়েছে “সমুদ্র বন” বা “চন্দ্র-বান্ধে (বাঁধে)” (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে।

টাইগার পয়েন্ট –এর পথ ধরে ভ্যান ঢুকে পড়লো সুশীলন এন জি ও-‘র প্রাংগনে । বাইরে থেকে বোঝার ক্ষমতা নেই কারো যে এমন বনে এতো সুন্দর দালান বাড়ি থাকতে পারে । এখানেই গেল বছরের শেষ শেষ সূর্যাস্ত দেখবার ভাগ্য নিয়ে এসেছি আমি । ঘরগুলো বেশ বড় এবং পরিচ্ছন্ন । ম্যানেজার হামিদ ভাইতো আগে থেকেই অতিথি আপ্যায়নে বেশ আয়োজন করেই রেখেছিলেন ।

শুটকি এবং নদীর মাছ দিয়েই দুপুরের আহার বিকেলে সেড়ে নিলাম । মালঞ্চ নদীর তীর ঘেসে এই গেস্টহাউজের বয়স দুই যুগ ছাড়িয়ে গেলেও জংগলের ভেতর বসে ওয়াই ফাই-এর সুবিধে পুরোটাই পেলাম ।

পরদিন খুব সকালেই ঘুম থেকে জেগে গেলাম , পৌষের রোদ মাখা সকালের একটি অন্যরকম দিন । যাত্রা শুরু করলাম কলাগাছির উদ্দেশ্যে , ইঞ্জিন চালিন যান পৌঁছে দিল ঘাট অব্দি ,তারপর পড়ে গেলাম মহা বিপত্তিতে । মাত্র তিন জনকে নিয়েতো আর জাহাজ যাবে না এতোটা রাস্তা । তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম আরো যদি সংগি জুটে যায় । যেতে আসতেই মালিক ভাড়া চাচ্ছে ২,৫০০ টাকা , তার সাথে ভ্রমণ ট্যাক্সতো আছেই ,আছে ক্যামেরা । এতোটা বহণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় ।

অপেক্ষা অবশ্য বেশিক্ষন করতে হয়নি ; কিছু সময়ের মধ্যেই ১০ জনের একটি দল আমাদের সাথে যোগ দিলেন । এদের বেশিরভাগ এসেছেন চট্রগ্রাম ও কুমিল্লা থেকে ছাত্র-ছাত্রি এবং তাদের অভিবাবক । বেশ মন ভালো হয়ে গেল এক সাথে এতো লোকের দেখা পেয়ে ।রয়েল বেংগল টাইগার এলেও এবার আমাদের দেখেই ভয় পাবে যেন ।

স্বচ্ছ্ব নদীর জল কাটিয়ে দু’ধারে গোল পাতা ছাপিয়ে কলাগাছি পৌঁছতে সময় লাগলো মাত্র আধ ঘন্টা । আমাদের সাদর সম্ভাষন জানালেন এক দল বানর , আমরা চানাচুর আর চিপ্স সাথে নিয়েছিলাম আগে থেকেই । এমন ভাবে খাবলে ধরলো হাতের মধ্যে , বানরের এই উদ্ভট আচরণ সত্যি ভয় পাবার মতো । গাইড বলে দিলেন ,ওদের বেশি খেপাতে না । কেওয়া –গর্জন ও গেওয়া গাছের সমন্বয়ে পরিবেষ্টত এই সুন্দরবন । যতো দূর চোখ যায় কেবল সরু রাস্তা আর সবুজ গাছ ।

কিছু দূর হাঁটার পর মনে হলো কোন এক অশ্বথের বুকে শরীর এলিয়ে দিতে , সত্যি তাই করলাম । আমি আর বেশীদূর হাঁটলাম না ; মধ্য দুপুরের সমস্ত ক্লান্তি যেন সপে দিলাম ওই বট বৃক্ষের হাতেই । ছোট ছোট কাঠের ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে নদীর জল , উপরে খোলা আকাশ আর চারপাশে অবিরর সবুজ , সুন্দরবন তুমি আসলেই সুন্দরীতমা ।

সুন্দরবনকে জালের মত জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা । মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ, অর্থাৎ ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদীনালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ অঞ্চল। বনভূমিটি, স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরনের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। জরিপ মোতাবেক ১০৬ বাঘ ও ১০০০০০ থেকে ১৫০০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে এখন সুন্দরবন এলাকায় ।

১০/১১ কিলোমিটার ঘুরে এসে আমরা দেখা পেলাম সেই চিত্রা হরিণের , অবাধে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে বনের মধ্যে । কেও যেন কোন বিরক্ত করবার নেই , বাঘ আর সিংহ বাস করে গহীন অরণ্যে ,ওখানে যাবার পার্মিশন পর্যটকদের নেই । যা দেখতে হবে এই জায়গার মধ্যেই , তবে আমার ইচ্ছে ছিল কুমির দেখার ,শুনেছি প্রাণীটি দেখতে হলে যেতে হবে আরো গহীণে ।

আর পুরো সুন্দরবন দর্শনের জন্য ভিউ পয়েন্টের ওপর দাঁড়ালে বিস্তৃত বন চোখের পরিধিতে চলে আসবে ।

সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে দেশি-বিদেশি সব ধরনের পর্যটকদের বন বিভাগ থেকে সরকারের রাজস্ব খাতে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে অনুমতি নিতে হয়।

গোটা সুন্দরবন জুড়েই পর্যটকরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারেন। তবে, এরমধ্যে করমজল, কটকা, কচিখালী, দুবলারচর, হিরণপয়েন্ট, কলাগাছিয়া, মানিকখালী, আন্দারমানিক ও দোবেকী এলাকায় পর্যটকরা বেশি ভ্রমণ করে থাকেন।

ফেরার পথে আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম পার্কে সারাটা বিকেল কাটিয়ে দিলাম । চুনা নদীর পাড়ে মনোরম পরিবেশে সুন্দরবন ভিত্তিক এ পর্যটন কেন্দ্রটি মন কেড়েছে পর্যটকদের। ছুটির দিনে পর্যটকদের ব্যাপক আগমনে পরিপূর্ণতা পায় আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম সেন্টার ,তবে আজ তেমন ভীড় নেই ।

দেখলাম আব্দুস সামাদ মৎস্য মিউজিয়াম। বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলে বাস করা বিভিন্ন জলজ প্রাণীর সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই ব্যতিক্রম ধরনের জাদুঘর। যা উপকূলবর্তী মানুষের জীবনচিত্র সম্পর্কে পর্যটকদের মনে করিয়ে দিবে ।

এছাড়াও বর্ষা রিসোর্টটি ইতিমধ্যে তাদের সার্ভিস ও লোকেশানের জন্য অনেক খ্যাতি অর্জন করেছে। রিসোর্টের উঠোনে দোলনা আছে, বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য স্লীপার আছে। দারুণ সুন্দর একটা বাঁধানো ঘাঁটওয়ালা পুকুর আছে যেখানে সাদা মাছের চাষ করা হয়। রিসোর্টটির তিনপাশেই রয়েছে সুন্দরবন ।পাশেই আছে নয়নাভিরাম ইকো পার্ক ও কাকরা খামার। সুন্দরবনে ঘুরার জন্য রিসোর্টের নিজস্ব জেটি এবং তিনটি বিভিন্ন আকৃতির ট্টলার ও লঞ্চ আছে আর ওরাই বন বিভাগের সব কিছু ব্যবস্থা করে দেয়।

জাহাজের রোমাঞ্চকর যাত্রার বাইরেও যে সড়ক পথে এতো অল্প সময়ে সুন্দরবন ভ্রমণ করা যায় তা একবার ঘুরে না এলে অজনাই থেকে যেত । ফেরার দিন সাতক্ষীরা শহরটিও ঘুরে দেখবার জন্য একদিন সময় পেলাম ,পুরনো শহর হলেও বেশ কিছু জায়গা ঘুরে নিলাম ।

মায়ের বাড়ী , মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট, জোড়া শিবমন্দির , মান্দারবাড়ি সমুদ্র সৈকত , এমন নয়নাভিরাম প্রকৃতির অপরূপ শোভা আমাকে চাঙা করে দিল । অবশেষে পরদিন পাক্কা চার ঘন্টা দৌলদিয়া ফেরি ঘাটে আটকে থেকে ঢাকা ফিরতে রাত দু’টো বেজে গেল । তাতে মনে কোন কষ্ট নেই , সুন্দরের যে বেলাভূমি দু’চোখে মেখে এনেছি তার অস্তিত্ব থাকবে চিরকাল ।

————————-রোদেলা নীলা

গল্পকার ও নাগরিক সাংবাদিক