পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা মায়া

0
1220

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী, পর্যটন প্রশিক্ষক এবং পর্যটন উদ্যোক্তা ফরিদা পারভীন মায়ার পথচলার গল্প।

ফরিদা পারভীন মায়া ১৯৭০ সালের ১লা ডিসেম্বর বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা এ.কে.এম ফজলুল হক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংবিধান প্রণেতাদের একজন ও সাবেক সংসদ সদস্য, মা মোমেনা হক ছিলেন গৃহিণী। তিন ভাই বোনের মধ্যে মায়া সবার বড়। এক ভাই বর্তমানে শ্যামনগর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং আরেক ভাই সফল ব্যবসায়ী। স্কুল জীবনের দুরন্ত ছুটে চলা কিশোরী মায়াকে ৯ম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসলেও পড়াশোনা বন্ধ করেন নি। ১৯৮৫ সালে ঈশ্বরীপুর আব্দুস সোবাহান হাইস্কুল থেকে এস.এস.সি পাস করেন এবং ১৯৮৭ সালে শ্যামনগর মহসিন কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাস করেন। ইতিমধ্যে প্রথম সন্তানের জননী হন তিনি, স্বামীর চাকরির সুবাদে ঢাকায় আসেন। তবুও পড়াশোনা বন্ধ না করে ভর্তি হন ঢাকা ইডেন কলেজে। সেখান থেকে ১৯৯২ সালে বিএ ও ১৯৯৫ সালে এমএ পাস করেন।

বিএ পড়াকালীন সময়ে আরো ২ সন্তানের জননী হন মায়া। একদিকে তিন সন্তানের লালন পালন আরেক দিকে নিজের পড়াশোনা তবুও মায়া অনেক কষ্ট করে বাচ্চাদের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। তবে সেক্ষেত্রে সাবেক সেনা কর্মকর্তা স্বামী লুৎফর রহমান এর অবদান ও উৎসাহ না থাকলে হয়তো মায়াকে থেমে যেতে হত। বিয়ের আগের থেকেই হাতের কাজ করতেন, নানান রকম সেলাই এর কাজ শিখেছেন, কিন্তু রান্নার প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না তিনি। অবশ্য বিয়ের পর প্রথম “সিদ্দিকা কবির”এর বই দেখে রান্না শিখতেন। পরে ১৯৯৫ সালের দিকে রাহিমা সুলতানা রিতার কাছে থেকে রান্নার উপর প্রশিক্ষণ নেন।

এরপর দিবালোক, আপনঘর ও গৃহসুখ নামের প্রতিষ্ঠান গুলো থেকে প্রথমে বেকিং পরে বিয়ের রান্না, মোগলাই, চাইনিজ কাবাব, ডেজার্ড সহ নানা বিষয় এবং হাতের কাজ মোম, ক্রিস্টাল, ড্রাইফ্লেয়ার, ব্লক বাটিক, ট্রাইডাই শিখে ১৯৯৮ সাল থেকে ঢাকা সি.এস.ডি সহ বিভিন্ন দোকানে শোপিস ও কেক, পিজ্জা সাপ্লাই দেওয়া শুরু করেন, পাশাপাশি ক্যাটারিং সার্ভিস শুরু করেন। ২০০০ সাল থেকে রান্না ও হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন “মায়ার বাঁধন কুকিং স্কুল”নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি, আজও একই ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন।

২০০৬ সালে রূপচাঁদা কুকিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১ম স্থান অর্জন করেন মায়া। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন থেকে কেক ও পেষ্টি উপর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। আগ্রহ আরও বেড়ে যায় এবং ১৪১৪ সেরা রাঁধুনি ১২তম, ২০০৮ সালে রূপচাঁদা সেরা রাঁধুনি ৪র্থ, ২০১০ সালে দি মনিটর মালয়েশিয়ান পামওয়েল ঢাকা অঞ্চলের ১ম, ২০১১ সালে মনিটর মালয়েশিয়ান পামওয়েল দেশব্যাপী চ্যাম্পিয়নশিপ এর গৌরব অর্জন করেন। এছাড়া সজীব নুডুলস রান্না প্রতিযোগিতায় ৩য় স্থান লাভ, কুলসুম ম্যাকারনী প্রতিযোগিতায় ২য় স্থান লাভ ও ২০১০ সালে ডিপ্লোমা মিষ্টি লড়াইয়ে ৩য় স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে এলজি বাটারফ্লাই এবং মউলিনেক্স এর কুকিং প্রশিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন।
২০১৪ সালে কুকিং এসোসিশেন নামে একটা সংগঠন শুরু হলে সেই সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ করেন। বর্তমানে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এবং সেই গঠনটির সভাপতি “কেকা ফেরদৌসী সাধারণ সম্পাদক “মেহেরুন নেসা। ২০১৮ সালে ITICA থেকে Level 1 শেফ কোর্স করেন মায়া এবং ২০১৯ সালে ITICA থেকে বেকিং এর উপর Level 2 কোর্স করছেন। নিয়মিত ক্যাটারিং বিজনেস এর পাশাপাশি কাজ ও রান্নার ক্লাস নেন অফলাইন ও অনলাইনে।

হলুদের ডালা সাজানো ও কেক এর অর্ডার নিয়মিত নেন। এছাড়া কুকিং এসোসিয়েশন এর পক্ষ থেকে অসহায় মেয়েদের জন্য রান্নার উপর নিয়মিত প্রশিক্ষক হিসাবে অংশ নেন। প্রিয় কেক ও ডেজার্ড নিয়ে কাজ করেন, বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য রেসিপি লেখেন নকশা তৈরি করেন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে রান্না বিষয়ক রেসিপি পাঠান। বাংলাদেশ টেলিভিশন সহ সকল চ্যানেলে রান্না বিষয়ক শো করেন মায়া। “Tupper ware” নামের একটি গ্রুপ অফ কোম্পানির জি.এম হিসাবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। মায়ার বড় ছেলে ডা: মেজর ফয়জুর রহমান এবং পুত্রবধূ ডা: মেজর মেহেরুনা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। মেঝ ছেলে জয় ও ছোট ছেলে জ্যাকি বিবিএ পড়ছেন। চাকুরী না করে ঘরে বসে যে কতো কিছু করা যায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ মায়া। তিনি মনে করেন একজন সফল নারী পর্যটন উদ্যোক্তা হতে সততা সবার উপরে। অবসরে “Mayar Badhon Cooking School” নামক ভালবাসার প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে নতুন নতুন রেসিপি লেখেন এবং গুন গুনিয়ে নীল ভ্রমরের মত গান করেন।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ ফরিদা পারভীন মায়ার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে তমার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। মায়ার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।