পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা ইভা

0
543

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী ট্যুরিজ্ম এডুকেটর এবং পর্যটন উদ্যোক্তা শারমিন ইসলাম ইভার পথচলার গল্প।

শারমিন ইসলাম ইভা ১৯৯১ সালের ২৪ মে ঢাকার রায়ের বাগের নিজ বাড়িতে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম যদিও রাজধানী ঢাকাতে কিন্তু তার পৈত্রিক নিবাস অবিভক্ত বাংলার এক কালের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত বৃহত্তর বিক্রমপুরে, বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজঙে। বাবা মোঃ শহিদুল ইসলাম একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী এবং মা রহিমা ইসলাম গৃহিণী। ইভার বসবাস এবং বেড়ে ওঠা যেহেতু ঢাকাতেই,পড়াশুনাও ঢাকাতেই।স্কুল জীবন শুরু হয় ঢাকার “হাজী শরিয়ত উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে।২০০৬ সালে দশম শ্রেনীতে অধ্যয়ন কালে মায়ের হঠাৎ অসুস্থতায় শিক্ষা জীবনে আকস্মিক ছেদ ঘটে। তিন বছর বিরতির পরে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে “কে এল জুবিলী হাই স্কুল এন্ড কলেজ” থেকে ২০০৯ সালে এসএসসি পাস করেন। ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ এন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন ২০১২ সালে।প্রচন্ড পরিশ্রমী আর অধ্যবসায়ী ইভা শুধু মাত্র নিজের জেদ আর আত্মবিশ্বাসী মনোভাবের কারনেই বিঘ্ন ঘটা সত্বেও একাডেমিক শিক্ষা জীবন শেষ করতে পেরেছেন।

দুইভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি কন্যা সন্তান হিসেবে বড়ো হওয়ায় মায়ের অসুস্থতার সময়টায় পরিবারের সবরকম দায়িত্ব তার কাঁধে এসে বর্তায়। এখান থেকেই শুরু তার সংগ্রামী জীবন, দায়িত্ববোধটাও অর্জন করেছেন পুরোপুরি এই সময়টায়। বাবা ব্যবসায়িক কাজেই ব্যস্ত থাকতেন।অসুস্থ মায়ের সেবাযত্ন , ভাই বোনদের দেখাশোনা আর সংসারের রান্না বান্নার দায়িত্ব পালন করার পরেও নিজের সহজাত মেধাকে শান দিতে তিনি প্রশিক্ষণ নেন পোষাক তৈরি ও বিউটিফিকেশন এর উপর। যথাযথ ভাবে এবং সফলতার সাথে কোর্স শেষ করে তিনি পোষাক তৈরির দিকে মনোযোগ দেন, উদ্দেশ্য টাকা উপার্জন, বেশকিছু টাকা জমে তার হাতে।

পরিবারে অভাব ছিলোনা কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী ইভা নিজের শখ নিজের উপার্জন দিয়েই পূরণ করতেন।ঐ সময়টাতেই রান্নার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়,পরিবারের বাধ্যতামূলক রান্নার পাশাপাশি নানা ধরনের খাবার তৈরি ছিলো তার প্রতিদিনকার রুটিন।তাছাড়া বংশগত ভাবে বিক্রমপুরের মানুষ হওয়ায় মেহমানদারি এবং আতিথিয়তা এসব রক্তে মিশে আছে।এছাড়া নিজের পরিবারের, আশেপাশের প্রতিবেশীদের পোষাক তৈরি আর বিভিন্ন সামাজিক পারিবারিক অনুষ্ঠানে ছোটদের বড়দের সাজিয়ে দেবার জন্যে তার ডাক পড়তো এবং এই করে তিনি তার এলাকায় বেশ সুনাম অর্জন করেন।এরপর তিনি মনোনিবেশ করেন তার কিছু স্বপ্ন পূরণে।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এর এনএইচটিটিআই থেকে বেকিং এন্ড কুকিং এর ওপর এক বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন এবং তিনমাস মেয়াদি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এটাচমেন্ট সম্পন্ন করেন বিএফসিসি (বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার) থেকে। ২০১৭ তে দুই দুইবার ঢাকার প্রথিতযশা পাঁচ তারকা হোটেল লা-মেরিডিয়ান থেকে পিঠা উৎসবের জন্য ডাক পান এবং পিঠা শেফ হিসেবে কাজ করেন।এবং পরে তার ভাল পারফরমেন্সের জন্য নিয়মিত অন-কলে বেকারি এন্ড পেস্ট্রিতে কাজ করতে থাকেন।বলে রাখা ভালো,এতো এতো ব্যস্ততার মধ্যেও ইভা তার ব্যচেলর ডিগ্রী অর্জন করেন ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ থেকে ২০১৭ সালে। এবছরই নারী উদ্যোক্তা হবার লক্ষ্যে তৈরি করেন নিজের অনলাইন প্লাটফর্ম “স্বাদ বৃত্ত”। ২০১৭ সালটা যেনো তার অর্জনের বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়।তিনি বেশকিছু মেলায় নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অংশ গ্রহণ করেন এবং প্রশংসিত হন।ঐ বছরই মহাখালীস্থ আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের স্পেশাল ভোকেশনাল এডুকেটর (বেকারি এন্ড পেস্ট্রি) হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।বছর খানেক কাজ করার পর চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ২০১৮ সালে নিজের অনলাইন বেইজড ফুড বিজনেস শুরু করেন।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ-কোরিয়া টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার থেকে বেকিং এন্ড পেস্ট্রির ওপর পেডাগোজি লেবেলে পার্ট-৪ সম্পন্ন করেন।একই বছর বিডব্লিউসিসিআই (বাংলাদেশ ওমেন চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি) থেকে “ফুড এন্ড বেভারেজ সার্ভিস এন্ড প্রোডাকশন এন্ড এন্টারপ্রেনারশিপ” এর ওপর ছয়মাস মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্স অর্জন করেন।এতো প্রশিক্ষণ নিয়েও তার মন ভরছিলো না। কেননা ততদিনে তিনি গভীর মনস্থির করে ফেলেছিলেন যে,নিজের ক্যারিয়ার তিনি এই সেক্টরেই গড়বেন, খাবার নিয়েই কাজ করবেন।আর তিনি বিশ্বাস করেন নিজের ভেতর সহজাত প্রতিভা যতই থাকুক,এটাকে শান দিতে একাডেমিক প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই।তাই তিনি ২০১৯ সালে আবারও ভর্তি হন এসিই হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউটে।সেখান থেকে তিনি কুকিং এর ওপর লেবেল ওয়ান কমপ্লিট করেন।

২০১৯ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সমমনা প্রতিভাবান জাপান প্রবাসী শাইখ মোহাম্মদ সবুজ এর সঙ্গে, যিনি নিজেও পেশায় একজন শেফ। পৈত্রিক সূত্রে ঢাকার অধিবাসী হলেও মাগুরার ছেলে সবুজ জাপানের একজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী।ইভার সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়া “স্বাদ বৃত্ত ” ২০২০ সালে এসে পুরোপুরি সচল হয় তার স্বামী সবুজের অনুপ্রেরণায় যিনি এর ফিনান্সে আছেন এবং একজন সন্মানিত এডভাইজার।ইভার স্বপ্ন -ইচ্ছা তার “স্বাদ বৃত্ত ” টাকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রথম কাতারে থাকা।স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী-সহোযোগী হিসেবে শেফ স্বামী তার পাশে আছেন।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ শারমিন ইসলাম ইভার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে তমার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। ইভার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।