পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা রাবেয়া

0
201

দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে এবং সেই মানুষগুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ও লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী, ইভেন্ট ব্যবসায়ী, পর্যটন উদ্যোক্তা উম্মে রাবেয়ার পথচলার গল্প।

উম্মে রাবেয়া ১৪ এপ্রিল ১৯৭৩ইং সালে ঢাকা জেলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সরকারী চাকুরী করতেন, মা ছিলেন গৃহিণী। ৯ ভাই বোনের বেশ বড় পরিবারে বেড়ে উঠেছেন রাবেয়া, বোনদের মধ্যে তিনি তৃতীয়। স্কুল জীবন শুরু হয় ঢাকাতেই। ১৯৮৮ সালে লেক সার্কাস গার্লস হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি পাস করেন এবং ১৯৯০ সালে সরকারী বাংলা কলেজ থেকে এইচ.এস.এসি পাস করেন। এরপর ১৯৯৩ সালে তেজগাঁও মহিলা কলেজ থেকে বিএ পাস করার পর শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। টানা ৪ বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৯৭ সালের ২০ জুন বিয়ের পিড়িতে বসেন সন্দীপ নিবাসী আকবর হোসেনের সাথে। বর্তমান নোয়াখালীতে বাড়ী করছেন। স্বামী পেশায় একাউন্স কর্মকর্তা এবং অসম্ভব ভালো একজন মানুষ।

ছোট বেলা থেকেই রান্নার প্রতি প্রবল আগ্রহ ও ভালোবাসা ছিল রাবেয়ার। সবাই যখন দৌড়, লাফ-ঝাপ খেলা করত, তখন তিনি মাটির হাড়ি পাতিল দিয়ে রান্না রান্না খেলতো একাই। এরপর মায়ের সাথে রান্নার কাজে সাহায্য করত এবং সখের বসে রান্নাও করত। পরবর্তীতে রান্না’র বেশিভাগটাই মা-খালাদের আদলে শিখেছেন। বিয়ের পর বড় ছেলের বউ হওয়াতে সংসারের গুরু দায়িত্ব পড়ে তার উপর। রান্না রান্না আর রান্নাতেই পড়ে থাকতে হতো বেশীর ভাগ সময়। মাঝে মাঝে সংসারের ঝড়-ঝাপটা পোহাতে হত। নীরবে, নিঃশব্দে, কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি, দিনশেষে আবার রক্তিম সূর্যের আলোতে দুঃখের পরাজয় হতো এটাই বোধ হয় রাবেয়ার জীবন । ১৯৯৮ সালে প্রথম সন্তান জন্মদান করেন।আনন্দে ডুবে থাকতেন সন্তানকে নিয়ে, ১৯৯৯ সালে রাবেয়ার বাবা দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলে খুবই ভেঙ্গে পড়েন তিনি।বাবার কাছ থেকে বাস্তব জীবনে চলতে শিখছেন তিনি। তার বাবা চাইতেন মেয়েরা অনেক পড়াশুনা করবে। তাই রাবেয়া নিজের ইচ্ছায় এবং স্বামীর সহযোগিতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৯৮-১৯৯৯ শিক্ষাবর্ষে মাস্টার্স পাস করেন। ২০০৪ সালে জ্যোৎস্নার আলোর মত হাসিমাখা এক কন্যা সন্তান জন্মদান করেন ।

কন্যা সন্তান জন্মের ১৯দিন পরেই মারা যান রাবেয়ার শাশুড়ি। সংসারের বড় ছেলের বউ হওয়ায় সবাইকে আগলে রাখতেন রাবেয়া। ২০০৭ সালে “হাইস্কেল মাইগ্রেন” ভিসা পেয়ে চলে যান ইংল্যান্ডে। শুরু করে জীবন যুদ্ধ , এবার ভিন্ন রকমের যুদ্ধ , নতুন জায়গা , নতুন দেশ , পরিচিত কেউ নেই। অবশ্য লন্ডন যাওয়ার আগে বেশ কিছু ট্রেনিং কোর্স করেছিলেন রাবেয়া। টুকটাক কাজের পাশাপাশি খাবার তৈরি করে হোম ডেলিভারি শুরু করেন। রাবেয়ার Rabaya’s Kitchen নামক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশী খাবার ভালোই বিক্রয় হচ্ছে। খাবার বিক্রির পাশাপাশি “ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট” শুরু করেন , বিয়ের , বৌভাত , পিকনিক , গায়ে হলুদ, সেমিনার , এমনকি ঘরোয়া যে কোন পার্টিতেও ইভেন্টের কাজ করেন রাবেয়ার প্রতিষ্ঠান।

২০১৩ সালে এনটিভি ইউরোপ কুকিং কুইন কম্পিটিশনে পার্টিসিপেন্ট করেন এবং কুকিং কুইন নির্বাচিত আলোচনায় উঠে আসেন। ২০১৪ সালে বাংলা টিভি পিঠা মেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০১৭ সালে এবং ২০১৯ সালে বাংলা টিভি পিঠা মেলায় পরপর দুইবার প্রথম স্থান অর্জন করেন। লন্ডনে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে পিঠা কুইন হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে নানা রকম প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ কোর্স চালানোর পাশাপাশি একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলেন যাতে রান্না বিষয়ক বিভিন্ন রেসিপি উপস্থাপন করেন নিয়মিত। রাবেয়ার ইউটিউব চ্যানেলের নাম “Rabaya’s Kitchen” রান্নার পাশাপাশি গার্ডেন করার তার একটি নেশা প্রতিবছরই প্রচুর ফুল, শাক -সবজির চাষাবাদ করেন এবং দেশী-বিদেশী ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। দিনের বেশীরভাগ সময় ব্যস্ত থাকেন রান্না নিয়ে, তিনি রান্না বিষয়ে আরও উচ্চতর পড়াশুনা করতে চান।

‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ উম্মে রাবেয়ার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে আফসারী রাবেয়ার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালী স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। রাবেয়ার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।