পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা জীনাত

0
685

ভূমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রাণান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী, পর্যটন উদ্যোক্তা ওয়াহীদা জীনাতকে।

ওয়াহীদা জীনাত ২৪ জানুয়ারি পুরাণ ঢাকার সূত্রাপুরে নানার বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে ওয়াহীদা সবার বড়। জন্মের পাঁচ মাস পর বাবার ব্যবসার সূত্রে নারায়ণগঞ্জে স্থানান্তরিত হন। সেখানেই শৈশব কৈশোর কেটেছে তার। পৈতৃক নিবাস শরিয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলায়। শৈশব থেকেই খুঁটিনাটি ক্রিয়েটিভ কাজের প্রতি খুব আগ্রহ ছিলো ওয়াহীদার। স্বভাবে চুপচাপ আর বই-পোকা ধরনের মানুষ ছিলেন। শিক্ষা জীবনে নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে মাধ্যমিক এবং ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজ উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ২০০৬ সালে ইডেন কলেজ থেকে স্নাতক (গণিত) এবং ২০০৯ সালে স্নাতকোত্তর (গণিত)ইডেন কলেজ থেকে শেষ করেন। মা অত্যন্ত ভালো রাঁধুনি হওয়ায় ছোট বেলা থেকেই মায়ের নিত্য-নতুন রান্না টেবিলে সাজাতে পছন্দ করতেন। তখনো রান্নার নেশা চেপে বসেনি ওয়াহীদার। কিন্তু রক্তে রান্নার গুন আছে, সেটা বাদ দিবেন কি করে।

২০০৫ সালে নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তার সাথে বিয়ের পর রান্নায় হাতেখড়ি শুরু করেন। শাশুড়ি ও ভীষণ ভালো রাঁধুনি ছিলেন। যদিও তাঁর ছত্র-ছায়ায় বেশি দিন থাকার সৌভাগ্য হয়নি। স্বামী অত্যন্ত ভোজন রসিক মানুষ। নতুন নতুন খাবারই হোক কিংবা ঐতিহ্যবাহী খাবার ওনার অনেক পছন্দের। পড়াশোনা চলাকালীন পিঠা-পিঠি দুই সন্তানের জন্ম দান করেন। তাই কখনো ৯-৫টা চাকরি করে হওয়া ওঠেনি। বাচ্চারা ছোট কার কাছে রেখে বাইরে যাবেন, এই চিন্তা করে দুই বার নিয়োগপত্র পাওয়ার পরও যোগদান করার সাহস যোগাতে পারেন নি। মূলত ২০১০ সালে ছোট সন্তান জন্মের পর একটু হতাশাও চেপে বসে। সেই সময় হতাশা কাটানোর জন্য ইন্টারনেটে বিভিন্ন ধরনের দেশী বিদেশি রান্না ও বেকিং দেখতেন এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট দেখে পড়াশোনা করতেন। আর মাঝে মধ্যে বিরল রান্না গুলো নিয়ে বাসায় চেষ্টা করতেন। এভাবেই এক’পা-দু’পা করে চলতে থাকেন। তারপর ফেসবুকে “Baking n Cooking” নামে অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি করে কাজ শুরু করেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং স্বামীর সহকর্মীরা, যখন খেয়ে প্রশংসা করতেন তখনই জোর মনোবল নিয়ে কাজ শুরু করেন। আস্তে আস্তে মনোযোগ দিয়ে রান্না আর বেকিং সমান তালে শিখতে থাকেন ইন্টারনেট থেকে।

স্বামীর চাকরীর সুবাদে কখনো এক জেলায় স্থায়ী ভাবে থাকা হয়নি। তাই কাজটাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবার নতুন জেলা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিয়ে কাজ করাটা সত্যিই কষ্টের। এমন অবস্থায় ২০১৮ তে খুলনা থাকাকালীন “ওমেন কালিনারী এসোসিয়েশন” এর একটি রন্ধন প্রতিযোগিতায় জীবনে প্রথম বার অংশ গ্রহণ করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। ওয়াহীদার বানানো ‘আমড়ার মুজ ‘ এই সম্মান এনে দেয়। মূলত এই ডেজার্ট দিয়েই ওয়াহীদার এই রান্নার জগতের তারকাদের সাথে পরিচয়। এরপর আর পিছে ফিরতে হয়নি। পরবর্তীতে স্বনামধন্য রিয়ালিটি শো ‘ড্যানকেক ডেজার্ট জিনিয়াস’ এর সেরা দশ ফাইনালিস্টে সিলেক্ট হন। এছাড়াও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের প্রতিযোগিতায় ও পুরস্কার পেয়েছেন। সম্প্রতি দেশী বিদেশি কেক আর্টিস্টদের পরিচালনায় ‘Global BD Sugar Artist’ এর সৌজন্যে ‘Bangladesh Cultivation Art and Heritage’ এ বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপর কেক কম্পিটিশনে পুরাণ ঢাকার সাকরাইন কে নিয়ে কেক বানিয়ে সকল বিচারকের মন কাড়েন।

২০২০ সালের মার্চে ঢাকার সবচেয়ে বড় হোম বেকারদের মিলন মেলা ‘Baker’s Festival’ এ অংশ গ্রহণ করে ব্যাপক সাড়া পান। বাসায় বসে কেক ডেজার্ট নিয়ে কাজ করছেন, সাথে নিত্য নতুন রান্না আর কেক নিয়ে গবেষণা করছেন। তাতে একদিকে বাচ্চাদের পুরো সময় চোখের কাছে রাখতে পারছেন অন্যদিকে বিজনেসও করতে পারছেন। কেক-ডেজার্টের ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন ও বইয়ে রেসিপি পাবলিশ করছেন। আবার রেসিপি পাবলিশ করার সুবাদে টুকটাক ফুড ফটোগ্রাফির চর্চা ও করছেন। আগামীতে ওয়াহীদা তার কাজ নিয়ে অনেক অনেক দুর যেতে চান। শুরুটা দেরীতে হলেও বাকি দিনগুলো শতভাগ জ্ঞান দিয়ে কাজ করতে চান। শুধু বেকার নয় রন্ধন শিল্পী হিসেবেও নিজের পরিচিতি তৈরি করতে চান তিনি।

উপসংহার; ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ ওয়াহীদা জীনাত এর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে ওয়াহীদার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রাণান্তর চেষ্টা করে তার সোনালি স্বপ্নকে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। ওয়াহীদার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।