পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা রূপা

0
1136

ভুমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রানান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, ফুড ক্যাটারিং ব্যবসায়ী, পর্যটন উদ্যোক্তা জাকিয়া জাহান রুপাকে।

রুপা ১৯৮১ সালে ১২ ই আগষ্ট ভাঁটি অঞ্চল খ্যাত কিশোরগঞ্জ জেলার নানা বাড়ির সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। পৈত্রিক নিবাস ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার জলইগাতী গ্রামে হলেও শৈশব কেটেছে রুপার নানার বাড়িতে । ছোটবেলায় অনেক হাড়ি-পাতিল নিয়ে গাছের লতা পাতা দিয়ে রান্না বান্না খেলা খেলতেন।যখন আরো একটু বড় হয় ,তখন পুকুর থেকে মাছ ধরে, ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে রান্না করেতেন। বান্ধবীদের সাথে নিয়ে প্রায় প্রতিদিন পিকনিক করতেন ।কিন্তু রুপার মা পচ্ছদ করতেন না।নানা নানীর আশকারাতেই প্রতিদিন পিকনিক করা সম্ভব হয়েছে।শৈশব কেটে অনেক আনন্দে।বাবা মেয়ের রান্না খুব পচ্ছন্দ করতেন এবং প্রশংসা করেতেন।বাবা মোঃ শামস্ উদ্দিন সমাজ সেবা অধিদপ্তরের প্রথম শ্রেনীর একজন কর্মকতা ছিলেন, তিনি বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত। মা ফিরোজা আক্তার একজন গৃহিনী। তিন ভাই বোনের মধ্যে রুপা সবার বড়। বাবা সরকারি চাকুরীর সুবাদে দেশের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে। স্বামী মুহাম্মদ জাকিরুল ইসলাম খান একজন প্রকৌশলী। তিনি গ্র্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানী লিমিটেড (জি টি সি এল )সরকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকতা। সংসার জীবনে রুপা এক মেয়ে ও এক ছেলের জননী। জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলায়। ১৯৯৭ সালে ভৈরব এম পি পাইলট গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৯৯ সালে রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। স্কুল ও কলেজে পড়াকালীন খেলাধুলা,সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গালর্স গাইড ও স্কাউট সাথে জড়িত ছিলেন। ২০০৬ সালে মাস্টার্স পরীক্ষার পর ব্রাক ব্যাংক লিমিটেড এ কিছুদিন চাকুরী করেন। এরপর পরিবারের মতে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন, শ্বশুরবাড়ি টাংগাইল সদরে। রুপার স্বামী যেহেতু সরকারী চাকুরী করতেন সে সময়ে যমুনা রিসোর্টে থাকতেন তখনই চাকরী ছাড়তে হয়। সে সময় লিটল স্টার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ২০০৭ সালে জয়েন করেন এবং ২০০৯ সাল পর্যন্ত সিনিয়র শিক্ষিকা হিসাবে চাকরী করেছেন। স্কুলের পরিচালনা পরিষদ থেকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকার সম্মান পান।বর্তমানে স্কুলটির নাম বঙ্গবন্ধু ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ , ভূয়াপুর , টাংগাইল।এরপর ঢাকায় চলে আসেন এবং বর্তমানে ঢাকার আদাবর, মোহাম্মদপুরে থাকেন।

রান্নার প্রথম হাতেখড়ি মায়ের কাছ থেকে, রুপার মা কখনই বাহিরের খাবার খেতে দিতেন না। চিপস থেকে শুরু করে প্রায় সব খাবারেই নিজের হাতে তৈরী করে খাওয়াতেন। এস.এস.সি প্রাক্টিক্যাল পরীক্ষার সময় পোলাও রোস্ট রান্না শেখেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকা শিরিন আক্তারের কাছ থেকে। সবাই খুব প্রশংসা করেন।তখন থেকেই রান্নার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। কলেজের লাইব্রেরি থেকে সিদ্দিকা কবীরের রেসিপির বই নেন এবং দেখে রান্না শেখা শুরু করেন। এছাড়া টিভি দেখে রান্না শিখেছেন, শ্রদ্ধেয় সিদ্দিক কবীর, কেকা ফেরদৌসী, লবী রহমান, রহিমা আক্তার রীতা, আলপনা হাবীব ও কল্পনা রহমান প্রমুখ এর থেকে। তাছাড়া রুপার শাশুড়ী মা ,মা ও খালাদের কথা না বলেই নয় ওনাদের কাছ থেকে ট্র্যাডিশনাল খাবার , বিভিন্ন রকম পিঠাপুলি আচার তৈরি ইত্যাদি শিখেছেন।

২০১১ সালে আরা কালেশনের হুসনে আরা আপার কাছ থেকে প্রথম কেক সহ আরো কিছু রান্না শেখেন। এরপর থেকে শুরু হলো রান্না শেখার নেশা। ২০১৩ সালে পর্যটন করপোরেশন থেকে বেকারী এন্ড পেষ্টি প্রোডাকশন সাটিফিকেট কোর্স করেন এবং “হোটেল অবকাশ”ইন্টার্নি করেন। ২০১৬ সালে লিপি’স ইউফরিয়া থেকে ফুড এন্ড বেভারেজ প্রোডাকশনের উপর শর্ট কোর্স করেন। এরপর রুপার আগ্রহ বেড়ে যায়। স্বামীর অনুপ্রেরনায় ২০১৬ সালে টনি খান কালিনারী ইনস্টিটিউট এন্ড হোটেল ম্যানেজমেন্ট থেকে এক বছরের শেফ কোর্স করেন ফুড এন্ড বেভারীজ প্রোডাকশন উপর। ২০১৬ সালেই বাংলাদেশ টেকনিকাল এডুকেশন র্বোড, ঢাকার অধিনে সাটিফিকেট ইন ন্যাশনাল স্কিল ষ্ট্যাণ্ডার্ড বেসিক কোর্সে কৃতির্ত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।

২০১৬ সালে NTVQF LEVEL- 1 ও ২০১৭ সালে NTVQF LEVEL-2 , ইউসেফ বাংলাদেশ থেকে অত্যন্ত কৃতির্ত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। ২০১৯ সালে NTVQF LEVEL- 4 (অনলি এসেসর পার্ট) ইউসেফ বাংলাদেশ থেকে competent হন। বর্তমানে রুপা বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা র্বোডের একজন এসেসর, শেফ,রন্ধনশ্ল্পী। তিনি বর্তমানে উইমেন কালিনারী এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ একজন সদস্য।চ্যানেল আই সহ দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্র পত্রিকায় নিয়মিত রেসিপি পাঠান।টিভি প্রোগ্রাম করেন। RUPA’s kitchen নামে অনলাইন ফুড সার্ভিস সেবা দিচ্ছেন।অনলাইন ও অফলাইনে খাবারে অর্ডার নেন, কার্ভিংও করেন, গায়ে হলুদ,জন্মদিনের বিভিন্ন অর্ডারের কাজ গুলো করতে বেশী পচ্ছদ করেন। বাসায় মাঝে মধ্যে কুকিং ক্লাস নেন, বিভিন্ন রান্নার প্রতিযোগিতা ও অনুষ্টান গুলোতে অংশগ্রহন করেন। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পুরস্কার গ্রহন করেছেন।অতি সম্প্রতি তিনি হাওর পর্যটন নিয়ে কাজ করছেন।

উপসংহার; ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ জাকিয়া জাহান রুপার উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে রুপার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রানান্তর চেষ্টা করে তার সোনালি স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। রুপার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।