পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা সাথী

0
996

ভুমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রানান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন তরুনী, পর্যটন ব্যবসায়ী ও ট্যুর অপারেটর শারমিন আক্তার সাথীকে।

‘সাথী’ নামটাই যেন বন্ধুতের টানের জানান দেয়। ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসের ২৮তারিখ, রাজশাহীতে বসবাসরত এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মা আর এক ভাইয়ের ছোট সংসারে আলো হয়ে আসে সাথী। পৈত্রিক নিবাস সিরাজগঞ্জ হওয়া সত্ত্বেও জন্ম ও বেড়ে উঠা সবটাই রাজশাহীতে। জন্মস্থানের প্রতি তার এই টান তাকে যেন একদম রাজশাহীর স্থানীয় বাসিন্দা করে তুলেছে।

সাথী রাজশাহী শহরের প্রান কেন্দ্রে অবস্থিত স্বনামধন্য পি.এন. বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে এসএসসি পাস করেন। বিদ্যালয়ের ছোট্ট ও দুষ্টু ছাত্রী হিসেবে পরিচিত সাথী স্যার ম্যাডামদের ভালোবাসা পেয়েছিল অঢেল। অতঃপর রাজশাহী সিটি কলেজ থেকে ২০১০ সালে এইচএসসি পাস করেন। আইন নিয়ে পড়ার শখ থাকলেও মায়ের ইচ্ছায় বিবিএ কমপ্লিট করেন। এরপর একে একে বিভিন্ন কম্পিউটার কোর্স, স্পোকেন ইংলিশ কোর্স করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ২০১৮ সালে এমবিএ কমপ্লিট করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি শখ আর ভালো লাগা থেকেই টিউশনি করতেন, শিক্ষক হয়ে নয় ছাত্র ছাত্রীদের সাথে বন্ধুত্ব সুলভ আচরণের মাধ্যমেই শিক্ষা দিতে পছন্দ করতেন তিনি।

ছোট বেলা থেকেই সাথী বাবা মা আর বড় ভাইয়ের আদর, ছায়ায় বড় হন। হাতে গোনা খুব অল্প সংখ্যক কিছু বন্ধু তার, কিন্তু সাথীর মতে তারা খুব স্পেশাল। বাইরের জগৎ সম্পর্কে একদম বেমালুম একজন মানুষ কখনো জানতেও পারেনি পরিবার ও বন্ধু ছাড়াও বাইরে একটা জগৎ আছে। বলা যায় বাবা মা ও ভাইয়ের অতি আদর ও তাদের ছোট্ট মেয়ে টাকে হারানোর অকারণ ভয় সাথীকে আরো ঘরকুনো করে ফেলেছিলো। তাতে যদিও কখনো কোন অভিযোগ ছিলো না তার। বন্ধুদের আড্ডা, পিকনিক, বিভিন্ন ট্যুর সব কিছু থেকেই সে নিজেকে খুব সহজেই আড়াল করে ফেলতো আর বলতো “না রে আম্মু খুব চিন্তা করবে আমার যাওয়া হবেনা”! তাতে প্রতিবারই বাহির টা দেখার আগ্রহ যেন তার আরো প্রবল হত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ চলা কালীন সময়ে একদিন বড় ভাই ফোনে ট্যুরিজম নিয়ে আইডিয়া শেয়ার করলো। সাথী সেটার নাম ও ঠিক করে ফেললো “স্বপ্নপাড়ি”। পর্যটন নিয়ে স্বপ্নটার শুরুও যেন সেখান থেকেই। এমবিএ কমপ্লিট করে বিগ বি’ য়ের কথায় স্বপ্নপাড়ি জয়েন ও করলো সে। সাথীর ভাষায় ” বিগ বি আমার ভাই অন্য মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আর এক ভাই আমার, কারন কিছু সম্পর্ক আত্মার হয়”!
ছোট থেকে পুরোটা সময় এক বিন্দুর মধ্যে বড় হওয়া সাথী খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছিলো শুধু বই পড়েই পাহাড় আর সমুদ্রের বিশালতা মাপা সম্ভব না। প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে অবলোকন করতে হয়। ইট পাথর না সবুজ ভেজা ঘাসেও পা ফেলে দৌড়াতে হয়।


নিজের সব সুপ্ত ইচ্ছা গুলোকে সাথী অন্যের মাধ্যমে পূরন করার স্বপ্ন তো দেখেই ফেলেছিলো, এবার তা সফল করার পালা। ট্রাভেল গ্রুপ স্বপ্নপাড়িকে সে তিলে তিলে নিজের সন্তানের মতোই বড় করতে থাকে যেন সবাই তাদের অদেখা গুলো দেখতে পারে৷ দূরের নীল আকাশ, পাহাড়, ঝর্না, সমুদ্র যেন আর শুধু বইয়ের পাতায় গল্প হয়ে না থাকে সকলের কাছে এইটাই হয়ে ওঠে তার মূল লক্ষ্য।

সাথী বিশ্বাস করে প্রকৃতিই আমাদের শ্রেষ্ঠ ও বাস্তব শিক্ষা দান করে। সেজন্য বরাবরই “স্বপ্নপাড়ির” মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের কম খরচে ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছেন। এখনো এই পক্রিয়া চালু রেখেছেন তিনি। মাঝে মাঝে শত ব্যস্ততার মাঝেও ব্যাকপ্যাক নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন তিনিও, তবে মজার বিষয় নিজের প্রতিষ্ঠান হয়েও তা আড়াল করে ট্যুরিস্ট দের সাথে সাধারণ হয়েই ভ্রমণ করেন তিনি, লক্ষ্য ভ্রমন চলাকালীন তার ট্যুরিস্ট দের কোন সমস্যা তাদের একজন হয়ে বুঝতে পারা ও সে অনুযায়ী ডেভলোপ করা, যদিও আড়ালে থেকেই চটজলদি তার সমাধান করে দেন তখনই। “স্বপ্নপাড়ি” ছাত্র-ছাত্রীদের সুলভ মূল্যে ভ্রমনই নয়, প্রকৃতি দেখার সুযোগ করে দিয়েছে সমাজের সকল বয়সের মানুষদের।

সাথীর মতে “সবুজ প্রকৃতির মাঝে বিলীন হতে চাওয়া মানুষ গুলোকে আমার কাছে পৃথিবীর শুদ্ধতম মানুষ মনে হয়। নিজের স্বপ্ন গুলো অন্যের মাধ্যমে পূরন হতে দেখার মধ্যে লক্ষাধিক সুখ নিহিত ”। বর্তমানে সাথী ” স্বপ্নপাড়ি” কে এগিয়ে নিতে দিন রাত পরিশ্রম করে চলেছে। সাথীর চেষ্টা স্বপ্নপাড়ির মাধ্যমে সহজ, সুলভ ও সুস্থ ভ্রমণ সকলের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে দেয়া। এসবের পাশাপাশি উনি খুব ভালো গান করেন ও গীটার বাজান। ব্যস্ত জীবনে চর্চা সেভাবে না করতে পারলেও গান ও নিজের গীটার দুটোই খুব ভালোবাসেন তিনি।

ভবিষ্যতে “স্বপ্নপাড়ি” গল্প নিয়ে বই প্রকাশের ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি। আগামী দিনে বরেন্দ্র পর্যটন বা হেরিটেজ পর্যটনকে ফোকাস করতে বরেন্দ্র পর্যটন রিসোর্ট নামে একটা রিসোর্ট করার স্বপ্ন দেখেন।

উপসংহার; ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ শারমিন আক্তার সাথীর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে সাথীর যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রানান্তর চেষ্টা করে তার সোনালি স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। সাথীর এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।