পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা রিপনা বেগম

0
1177

ভুমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রানান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন রন্ধন শিল্পী, রেস্টুরেন্ট ওনার, পর্যটন ব্যবসায়ী রিপনা বেগমকে।

রিপনা ১৯৭৭ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি, সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার পশ্চিম বড়হাট এলাকার বড়বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মৃত আব্দুল জলিল ছিলেন ব্যবসায়ী আর মাতা সিরাজুননেসা ছিলেন একজন সুগৃহিনী। দুই ভাই আর দুই বোনের মধ্যে রিপনা সবার বড়। রিপনা স্নাতক পর্যন্ত মৌলভীবাজারেই পড়া লেখা করেন, ১৯৯৪ সালে শাহ হেলাল উচ্চ বিদ্যালয়, হিলালপুর, মৌলভীবাজার থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালে যথাক্রমে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি পাশ করেন। তিনি যখন সিলেট ল’কলেজ আইন বিষয়ে এবং  এম,সি কলেজে ইকোনোমিক্সে মাস্টার্সে ভর্তি হন তার ছয় মাসের মাথায় ২০০০ সালের ২৮ জানুয়ারি তে বি-বাড়িয়ার শেখ আবু মোহাম্মদ অছির সাথে তার বিয়ে হয়ে যায় যিনি একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে নারায়নগঞ্জে চাকুরীরত ছিলেন। বিয়ের পরও রিপনা লেখাপড়া ছাড়েননি কিন্ত ভাগ্য এমন ছিলো সেই সময় সেশন জটের কারনে এল,এল,বি ফার্স্ট পার্ট এবং মাস্টার্স প্রিলির পরিক্ষার ডেট এমন সময় পড়ে যায় যখন তিনি মা হওয়ার অন্তিমক্ষনে কি আর করা  পরিক্ষা গুলো আর দিতে পারেনি। ২০০১ সালের মার্চ মাসের তিনি প্রথম কন্যা সন্তানের মা হলেন। তখনকার মতো লেখাপড়া সেখানেই থেমে গেলো, তখন তিনি স্বামীর সাথে নারায়নগঞ্জে থাকতেন। লেখাপড়া ছেড়ে দিলে কি হবে রিপনা নিজেকে স্বাবলম্বী করতে একটা প্রাইভেট ইন্সটিউটে ফ্যাশন ডিজাইনের কোর্সে  ভর্তি হয়ে সেলাই, ব্লক, বাটিক, স্কিনপ্রিন্টের কাজ শিখেন ও ঘরেই একটা ছোটখাটো বুটিক শুরু করেন। ২০০৪  সালে তার কোল জুড়ে আরেকটা কন্যা সন্তান আসে এবং তার পরিবার পূর্ণ হয়।

২০০৬ সালে স্বামীর ব্যবসার জন্য রিপনাকে পূনরায় মৌলভীবাজারে চলে আসতে হয় কিন্তু তিনি তার বুটিক ব্যবসা বন্ধ করেননি। মৌলভীবাজারে তিনি ঘরোয়া ভাবে বুটিকের পাশাপাশি একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুলও চালু করেন এবং নিজেই স্কুলের প্রিন্সিপালের পদে থাকেন। প্রায় তিন বছর পর মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর জন্য রিপনা ২০১০ সালে সিলেটে চলে আসেন।  সিলেটে চলে আসার আগে তিনি স্কুলের দায়িত্ব ছেড়ে দেন। কিন্তু বুটিক সিলেটে এসেও চালিয়ে যান। এরই মধ্যে টিভিতে  বিভিন্ন রান্না বিষয়ক  রিয়েলিটি শো চালু হয় এবং সেটা দেখে রিপনা অংশগ্রহনের জন্য আগ্রহী হন। কারন রিপনা ছোট থেকেই খুব ভালো রান্না করতে পারতেন আর এই রান্নার হাত তিনি তার মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন  কারন রিপনার মা খুব ভালো রাধুনি ছিলেন। 

রিপনা সিদ্দিকা কবিরের এর একজন বড় ফ্যান হয়ে ওঠেন,  যখন থেকে সিদ্দিকা কবির’স  এর রান্নার অনুস্টান এন, টিভিতে শুরু হয় তিনি তখন থেকে শেষ পর্যন্ত মনযোগ দিয়ে দেখতেন এবং চেস্টা করতেন উনার রেসিপি ফলো করে রান্না করার। পরবর্তিতে দেশের বাইরের ও ভিতরের অনেক শেফকেই তিনি  ফলো করতেন এবং বাংলাদেশের শেফদের মধ্যে তিনি ওয়ার্ল্ড সেলিব্রেটি শেফ টনি খানকে খুব শ্রদ্ধা ও পছন্দ অনুসরন  করেন। বিভিন্ন রান্না বিষয়ক বই, গুগল সার্চ ও রান্না বিষয়ক  বিভিন্ন টিভি শো দেখে নিজেকে মোটামোটি কালিনারি জগতের জন্য গড়ে তুলেছিলেন।

টিভি রিয়েলিটি শোতে অংশ করা একটা নেশায় পরিনত হয়। ২০১৬ তে রুপচাদা দি ডেইলি স্টার সুপার শেফ এর রিজোনাল রাউন্ডে জয়ি হয়ে ঢাকা অডিশন রাউন্ডে বাদ পরে যান পরের বছরেও একই অবস্থা হওয়ায় রিপনা চিন্তা করেন কুকিং এর কোর্স করা দরকার, ভাগ্য ও প্রসন্ন ছিলো ২০১৭ সালেই সিলেটে” টনি খান হোটেল ম্যানেজমেনন্ট ইন্সটিটিউট” কার্যক্রম  শুরু করে এবং রিপনা সেখানের প্রথম ব্যাচের স্টুডেন্ট হিসেবে ভর্তি হন। নিজের প্রচেস্টায় কালিনারি জগত সম্পর্কে জানার কারণে তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্সটিটিউটের শেফ ট্রেইনারের দায়িত্ব পেয়ে যান এবং Tourism & Hospitality Sector থেকে SEIP,ISC প্রজেক্টের ট্রেইনার হিসেবে নিযুক্ত হন। 

পরের বছরই তিনি আবার রুপচাদা সুপার শেফে অংশ গ্রহন করেন এবং সরাসরি এপ্রোন পেয়ে মূল রাউন্ডে ঢুকে পরেন এবং বিশজন কন্টেস্টেন্টের মধ্যে টপ ফাইভের খেতাব লাভ করেন।সুপার শেফে টপ ফাইভ হওয়ার পর রিপনা উৎসাহিত হয়ে নিজেকে এই জগতে আপডেট করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় কুকিং লেভেল ওয়ান,বেকিং লেভেল টু এবং পেডাগজি লেভেল ফোর এসেসর ও ট্রেইনার পার্ট খুব সফলতার সাথে করে নেন। আর ট্রেইনার হিসেবে দায়িত্ব এবং নিজেকে আপডেট করার জন্য যে সময় দরকার ছিলো সেটা দেয়ার পর আর বুটিক। চালাতে না পারার কারনে রিপনা বুটিকের ব্যবসা ২০১৭ সালেই ছেড়ে দেন।

একজন সফল ট্রেইনার হিসেবে রিপনার ২০১৮ সালে SEIP এর পক্ষ থেকে  NYPi  ( নানিয়াং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট) সিংগাপুর- এ  Food safety & Food prossasing  এর উপর ১৫ দিনের ট্রেইনিং করার সুযোগ পান।  রিপনা ২০১৬ থেকেই বুটিকের পাশাপাশি খাবার সাপ্লাই দিতে থাকেন বুটিক বন্ধ হলেও  খাবার সাপ্লাই দেয়া বন্ধ করেননি কারন এটা তার পেশার সাথে সামজ্জস্যপূর্ণ চিলো। ২০১৯ সালে রিপনা আরো তিনজন পর্যটন উদ্যোক্তাকে সাথে নিয়ে সিলেটে কাজী এস্পারাগাস ফুডকোর্ট শাখায়  RKR Gyro নামে একটা খাবারের দোকান চালু করেন যা নবেম্বর  ২০১৯ এ শুরু হয় এবং সফলতার সাথে চার মাস পার করার পর বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে বন্ধ আছে। 

একটা কথা না লিখলেই নয় রিপনা নিজে একজন উদ্যোক্তাতো বটেই আবার তিনি উদ্যোক্তা  গড়ার কারিগর। বিশেষ  করে নারী  উদ্যোক্তা, তার হাতে গড়া অনেক নারী  উদ্যোক্তা বর্তমানে সিলেটে ভালো ব্যবসা করে যাচ্ছেন। তিনি নিজের ইন্সটিটিউটে নারীদের  BWCCI, SEIP. এর প্রশিক্ষন দিয়ে থাকেন এবং একাধারে তিনি তাদের জব প্লেসমেন্ট অফিসার।  

বর্তমান পরিস্থিতিতে  সব বন্ধ থাকলেও তিনি অনলাইনে কুকিং ক্লাস ও বিভিন্ন ফুড সার্ভিসের মাধ্যমে খাবার সাপ্লাই দিয়ে থাকেন। ভবিষ্যতে কি হবে রিপনা জানেননা ঠিকই কিন্তু তিনি নিজেকে একজন সফল নারী পর্যটন উদ্ধ্যোক্তা ও সফল একজন মানুষ হিসেবে দেখতে আশাবাদী এবং এর জন্য তিনি প্রানপন চেস্টা চালিয়ে যাবেন সাধ্য অনুযায়ী।

উপসংহার; ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ রিপনা বেগম এর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে রিপনার যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রানান্তর চেষ্টা করে তার সোনালি স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। রিপনার এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।