পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা হাসিনা আনসার

0
612

ভুমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রানান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন গুনী রন্ধন শিল্পী, ফ্রোজেন ফুড ও ক্যাটারিং ব্যবসায়ী এবং পর্যটন ব্যবসায়ী, হাসিনা আসনার নাহারকে।

প্রচন্ড মনোবল, প্রবল ইচ্ছা শক্তি আর নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা, ধৈর্য ও কাজের প্রতি ভালবাসা থাকলে একজন সফল পর্যটন উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব। কোনো ভাবেই হাল ছাড়া যাবে না,যত বাধাই আসুক মুক্তি যোদ্ধা বাবার মেধাবী সন্তান নারী উদ্যোক্তা হাসিনা আনছার নাহারের জন্ম ১৯৮০ সালে কুষ্টিয়া শহরের আমলাপাড়ায়। নাহারের বাবা একজন সমাজ সেবক, রাজনীতিবিদ। তিনি কুষ্টিয়া চেম্বার অফ কমার্স এর প্রেসিডেন্ট হিসাবে ১৯৮০-১৯৯১ সালে দুবার ছিলেন। তিনি কুষ্টিয়া পৌরসভার ২ বার কমিশনার ছিলেন এবং জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ছিলেন।

৫ ভাই বোনদের মধ্যে সবার ছোট নাহার। বাবা মায়ের অতি আদরের সন্তান। বাবা ব্যস্ততার মাঝেও সময় দিয়ে নাহারকে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। মা সুরাইয়া আহম্মেদ একজন গৃহিনী বলতে পারেন বেগম রোকেয়ার রশনা বিলাশ গল্পের পাক্কা রাধুনি।

১৯৯৫ সালে কুষ্টিয়া সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্তের সাথে মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্টার মার্কস পেয়ে পুরো বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন এবং বিদ্যালয়ে থেকে পুরস্কার পান। কুষ্টিয়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ১৯৯৭ সালে কৃতিতের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় Accounting a লেটার সহ পাশ করেন। ছোট বেলা থেকেই বাবার মতো সমাজ সেবা মুলক কাজ করার আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কারন বাবাকে দেখে এসেছে অসহায় দুস্থ মানুষের পাশে দাড়াতে। বাবা মাও সব সময় উৎসাহ দিতেন নাহারকে। মূলত মায়ের হাত ধরে রান্নার জগতে আসে নাহার।

বিয়ের পর স্বামী ও সন্তানদের স্বাস্থের কথা চিন্তা করে স্বাস্থ সম্মত পুষ্টিকর খাবার তৈরি করতে করতে কখন যে রন্ধন শিল্পের জগতে চলে এসেছে নাহার বুঝতেও পারেনি। নিত্যনতুন খাবার তৈরি করা এক রকম নেশা হয়ে যায়। পরিবারের ও শশুর বাড়ি থেকে অনেক উৎসাহ পেতে থাকেন। অতপর নাহারে ২ ছেলের পরামর্শে পর্যটন শিল্পের অন্যতম উপাদান catering business জড়িয়ে পড়েন। ছেলেরা তাকে অনলাইনে মার্কেটিং এর জন্য ফেসবুকে, রান্নার পেজ ও you tube a channel খুলে দেয়। নাহারের প্রতিষ্ঠান এর নাম Nahar Cooking World. বর্তমানে মাসে ৬০০- ৭০০ জনের খাবারের অর্ডার আসে। নাহার মাল্টি কুইজিনের ওপর training নিয়েছে সেকারনে সব ধরনের খাবার তৈরি করতে পারে। বেকিং ও কুকিং সব রকম খাবার সরবরাহ করেন। সেই সাথে নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে সব রকম কুকিুুং ও বেকিং এর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। তার প্রতিষ্ঠান থেকে রান্নার প্রশিক্ষন নিয়ে অনেক নারী – উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নাহার ICI international culinary Institute থেকে এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এর অধীনে professional chef course level -1 সম্পূর্ন করে Master chef Daniel C Gomes er Institute প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে হোমশেফ থেকে British Colombia school এর বাচ্চাদের ও অভিভাবকদের ইজি ওয়েতে টিফিন বানানো র Live programme এর অফার করে। নাহারের প্রথৃম কুকিং show ছিল এটা। সবাই খুব পছন্দ করে পরবতীতে British Colombia school এর প্রধান শিক্ষক এর অনুরোধে নাহার কুকিং ক্লাস নেন। নাহার ক্যাটারিং ব্যবসার পাশাপাশি নিয়মিত রান্নার প্রশিক্ষন দিয়ে থাকেন।

ICI international culinary Institute এ ফলাফল ও অনান্য দিক বিবেচনা করে নাহারকে স্কলারশিপ প্রদান করে। যেকারনে বিনা খরচে, কারিগরিশিক্ষা বোড থেকে Assessor part level – 4 কোর্স করে। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষাবোর্ডে কুকিং এর ১জন এসেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে নাহার। ইউসেফ থেকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এর অধীনে বেকিং লেভেল ২ কোর্স করে। নাহার বিভিন্ন পত্র প্রত্রিকায় রেসিপি লিখে থাকে তারমধ্যে যায়যায় দিন, ইত্তেফাক, সমকাল, কালের কন্ঠ, আনন্দ আলো, আনন্দ ধারা, ইত্যাদি। এবার ঈদে চ্যানেল আই এর আনন্দ আলো থেকে আমার ২৫ টি রেসিপি র বই বের হয়েছে । টিভিতে বিভিন্ন রকম কুকিং programme করে থাকে নাহার। মিতা দীপ ও লবী রহমান প্রথম টিভি চ্যানেলে গাজী টিভিতে আমন্ত্রণ করে। পরে বিটিভি ও এটিএন বাংলা একুশে সহ বেশ কিছু টিভি শো করেন। মেহেরুন নেসার অনেক উৎসাহ দেন পরবতীতে চ্যানেল আই এ কুকিং শো করেন।
যমুনা টেলিভিশনে ৮ টি বিভাগ থেকে অসংখ্য রেসিপি নিয়ে বাছাই করে ৮ বিভাগ থেকে ৮ জনকে নিয়ে আঞ্চলিক কুকিং প্রগাম করে। সেখানে খুলনা বিভাগ থেকে নাহারের রেসিপি সিলেক্ট করে।

নাহার অবসর সময় কে কাজে লাগিয়ে নিজেকে নারী পর্যটন উদ্দোক্তা হিসেবে পরিচিত হতে বেশি গর্ববোধ করেন। নিজে কিছু করার মধ্যে আনন্দ খু্ঁজে বেড়ান। নাহার মনে করেন একজন সফল উদ্দোক্তা হতে গেলে সততা, ধৈর্য শীলতা, নীষঠাবান, পরীশোমী , মনোবল, নিজের প্রতি আত্নবিশ্বাস, ও কাজের প্রতি ভালবাসা থাকতে হবে । বর্তমান যুগ মিডিয়ার যুগ। নবীন উদ্দোক্তা কে মিডিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট গ্যান থাকতে হবে। মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনায় দক্ষ হতে হবে।

নাহারের সফলতার পিছনে পরিবার, শশুরবাড়ির লোকজন ও ২ বোন সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন। বিশেষ করে ২ ছেলে আর মা ছায়ার মতো ছিলেন। সকল জায়গায় নাহারের মা সাথে গিয়েছেন। সবাই বিভিন্ন রকম কটু কথা বলেছে কিন্তু মা সাথে থাকায় ভেতর আলাদা ১ টি শক্তি কাজ করেছে। নাহার কোনো বিষয়ে ব্যাথ হয়ে ফিরে আসেনি। আজ তাই আমি একজন সফল নারী পর্যটন উদ্দোক্তা। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে AJFB – ২০১৮ ও ২০১৯ সালে নারী শিল্প উদ্দোক্তা হিসেবে সম্মানোনা পেয়েছেন। যা আন্যান্য নারীদের উদ্দোক্তা হতে অনেক উৎসাহ প্রদান করেছে। নাহার কুকিং এসোসিয়েশনের পিঠা প্রতিযোগিতাই সারা বাংলাদেশ থেকে চতুর্থ হন। 11th International poultry cooking contest 2019 দেশের মধ্যে থেকে আমি টপ টেনে উত্তীর্ণ হন। Diploma dessert competition এ সেমি ফাইনাল এবং Rupchada super chef cooking এ অংশনেন।

নাহার তার প্রতিষ্ঠানকে আরও বড় করার স্বপ্ন দেখেন এবং বিভিন্ন জায়গায় শাখা করতে চান। তিনি আশা করেন সমাজে যারা অবহেলিত, অসহায়, বিধবা, এতিম, এদের নিয়ে কাজ করতে। এদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষনের মাধ্যমে এদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে সমাজে ১ টি শক্ত অবস্থানে দাড় করাতে। পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চান। সমাজে অনেক নারী আর্থিক দিক দিয়ে সচল না। এরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এত টাকা পয়সা খরচ করে বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষন নিতে পারে না। ভবিষ্যতে এদেরকে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিতে চান। সমাজে যেন নারীর মযাদা থাকে, এরা কারো তীরস্কারের স্বীকার না হয়ে নিজেরা উদ্দোক্তা হয়ে পরিবারের হাল ধরতে পারে।

উপসংহার; ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ হাসিনা আনসার নাহার এর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে নাহারের যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রানান্তর চেষ্টা করে তার সোনালি স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। নাহারের এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।