পর্যটনে নারী উদ্যোক্তা রুবিনা রুবি

0
950

ভুমিকাঃ ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ পত্রিকা সব সময় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে এবং শিল্পের সাথে যুক্ত কিছু ব্যতিক্রমী মানুষকে তুলে ধরার প্রানান্তর চেষ্টা করে, এবং সেই মানুষ গুলোর পর্যটন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার লড়াই কে সম্মান জানিয়ে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। আজ তুলে ধরবো তেমনি একজন গুনী রন্ধন শিল্পী, পর্যটন ব্যবসায়ী, হ্যন্ডিক্রাফট ব্যবসায়ী রুবিনা রায়হান রুবীকে।

সাধারন মানুষের অসাধারন হয়ে ওঠার পথের বাঁকে থাকে ছোট ছোট অনেক গল্প। যে গল্প বিশ্বাসের, যে গল্প পরিশ্রমের, যে গল্প ধৈর্য্য ধারনের, যে গল্প সাহসীকতার। ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয় পথচলা। নানা বাঁধা আসে চলার পথে। ঝুঁকি সামলে নিতে না নিতেই আবার ঝুঁকি সামনে চলে আসে। পথচলতে গিয়ে থেমে যাওয়া মানে তো সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। সাফল্য তাদের কাছেই ধরা দেয় যারা থেমে গিয়েও পথের শেষ দেখতে এগিয়ে যায়। তেমনিই একজন বাংলাদেশের বেকিং ও কেক জগতের অন্যতম পথিকৃৎ এবং রুবিনা’স কেক অ্যান্ড ডিলাইটের প্রতিষ্ঠাতা রুবিনা রায়হান রুবি, যিনি পরিচিত মহলে রুবিনা রুবি নামেই পরিচিত।


শতবাঁধা ডিঙ্গিয়ে রুবিনা রুবি আজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন চট্টগ্রামের একজন সফল পর্যটন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে, যাকে দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে শততরুণী। তবে আজকের এই সফল উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুটা কিন্তু মোটেও এতোটা মসৃণ ছিল না। হারিয়েছেন প্রথম সন্তানকে,সন্তানের মৃত্যুর পর থাকতে হয়েছে মেডিক্যালের আইসিইউতে, তবে তীব্র ইচ্ছেশক্তি ও কাজের প্রতি ভালবাসা থেকে ফিনিক্স পাখির মতই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন প্রতিবার।

রুবিনা রুবি ছোটবেলা থেকেই হস্তশিল্প ও কেক বানানোর প্রতি অসম্ভব আগ্রহী ছিলেন। তবে পড়াশোনার ফাঁকে পুরোপুরি ভাবে সেদিকে মনোযোগ দেয়া হয়ে উঠেনি, ১৯৮৩ সালে রাজশাহীর কাজিহাটায় সম্ভ্রান্ত মুসলীম পরিবারে জন্ম নেয়া রুবিনা রুবির। বাবা মোঃ এল ইউ খান ছিলেন একজন সভ্রান্ত ও প্রথিতযশা ব্যবসায়ী, তাই মা নবাবুন নেসার হাত ধরেই শিক্ষা জীবনের শুরু।

পড়াশোনা ও বেকিং শিল্পের প্রতি ভালবাসায় থেকে যখন চলছিল প্রস্তুতি, ঠিক তখনই ২০০৬ সালে তিনি গাঁটছড়া বাঁধেন নৌবাহিনীতে কর্মরত এস এম রায়হান রউফের সাথে। নিজস্ব জগতে অত্যন্ত সদালাপী এই মানুষটি বর্তমানে নৌবাহিনীর কমান্ডার পদে রয়েছেন। বিয়ের পর স্বামীর উৎসাহেই রুবিনা রুবির ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া, যার শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে ছোট একটি বিটার কেনার মাধ্যমে।

এরপরের গল্পটা অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও সংগ্রামের। অনলাইন ও অফলাইনে যখন ধীরে ধীরে শিখছিলেন বেকিং ও কেক বানানোর নানা কৌশল, ঠিক তখন ছন্দপতন। ২০০৮ সালে প্রথম সন্তান সন্তান যখন ভূমিষ্ঠের মাত্র একদিন পরেই পরপাড়ে পারি দেয় এবং রুবিনা রুবিকে দীর্ঘ ১০ দিন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আইসিইউতে কাটাতে হয়েছিল। সেখান থেকেই আবার তার ঘুরে দাঁড়ানো, এবং ২০১০ সালে তার কোল আলো করে আসে প্রথম কন্যা সন্তান। প্রিয় সন্তানকে সেরামানের খাবারের স্বাদ দিতে রন্ধনশিল্পের প্রতি আরও মনযোগী হয়ে ওঠা। অতঃপর, বিশ্বখ্যাত টিএলসি চ্যানেলের ফুড-প্রোগ্রাম এক্সট্রিম কেক মেকার দেখে তার আজন্মলালিত বেকিং শিল্পের প্রতি আগ্রহের উন্মাদনা তুঙ্গে ওঠা।


১৯৯৯ সালে রাজশাহীর সরকারী হেলেনাবাদ স্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০০৩ সালে রাজশাহী সরকারী সিটি কলেজ থেকে এইসএসসি পাশের পর, স্কুল ও কলজে জীবনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা প্রতিভাবান এই নারী ২০০৯ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে সাফল্যের সাথে অনার্স সম্পন্ন করেন। ভাবছেন, এসএসসি ও এইসএসসির মাঝে কেন চার বছরের গ্যাপ।এই পরিশ্রমী পর্যটন উদ্যোক্তার সংগ্রামের শুরু ঠিক এই সময় থেকেই। এসএসসি পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের পর যখন স্বপ্ন দেখছিলেন নিজেকে নতুন করে কলেজ জীবনে রাঙাতে, ঠিক তখনই দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে দুই বছরের এক ক্ষতির সম্মুখীন হলেন। তবে দমে যাননি, লড়ে গেছেন অনার্স পর্যন্ত। তবে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে চলছিল ছোটবেলায় হস্তশিল্প ও বেকিংয়ের প্রতি আগ্রহী রুবিনা রুবির পরবর্তী জীবনের সফল উদ্যোক্তার হওয়ার প্রস্তুতি।

প্রস্তুতির এই পর্যায়ে, প্রতিবেশী ও পরিচিত মহলের অনেকেই কেকের অর্ডার শুরু করেন, যা ছোট রান্নাঘরের থেকেই সরবরাহ শুরু করেন। এছাড়াও নিজে সম্পন্ন করেন ফুড এন্ড বেভারেজ প্রোডাকশন কোর্স যা তাকে দিয়েছে নতুন দিশা। তার বানানো কেকের সুনাম বৃদ্ধির সাথে সাথে, পরিচিতমহলের আগ্রহ ছাপিয়ে যখন বেকিংয়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন বৃহৎ পরিসরে যাত্রা শুরু করেন নিজের ব্র্যান্ড রুবিনা’স কেক ও ডিলাইট নিয়ে। পাশাপাশি, হস্তশিল্পের প্রতি আগ্রহ থেকে প্রতিষ্ঠা করেন রুবিনা’স ক্রাফট অ্যান্ড ক্রিয়েশন ২০১৮ সালে। ইতিমধ্যেই, চট্টলাবাসীর কাছে বেকিং ও কুকিং জগতের অনন্য এক ভালোবাসারর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে রুবিনা’স কেক ও ডিলাইট এর কেক। ব্যক্তিগতজীবনে পেইন্টিংয়ে আগ্রহী রুবিনা রুবির ব্যতিক্রমী কেক ডিজাইন ও বেকিং ইতিমধ্যেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সবার।

বর্তমানে দারুন সফল এই কুকিং ও বেকিং উদ্যোক্তা নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কারুশৈলী কুটির শিল্পের। এখানে থেকে নিশ্চিত করছেন তার মত স্বপ্ন দেখা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার পথ খুঁজে চলা অজস্র নারীর জন্য মসৃণ যাত্রাপথ তৈরি করতে।

সফল নারী উদ্যোক্তা রুবিনা রুবি বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন কেকের ডিজাইন নিয়ে কাজ করছেন। এছাড়াও নানারকম ভেরিয়েশন যেমন চকলেট, ফন্ডেন্ট, বাটারক্রিম নিয়ে কাজ করছেন। তার প্রতিষ্ঠান রুবিনা’স কেক ও ডিলাইট বর্তমানে জন্মদিন, হলুদ, বিবাহবার্ষিকী ও স্পেশাল-ডে উপলক্ষে ডিজাইনার ও কাস্টমাইজ থিমের কেকের সরবরাহ করছে। এছাড়াও, তরুণ-তরুণীদের জন্য কেক ও ডেসার্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে যেন তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।

সফল এই নারী উদ্যোক্তা স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশের একজন এক্সট্রিম ফ্রন্টলাইন বেকিং ও কেকমেকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার। এছাড়াও স্বপ্ন দেখেন নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বেকিং ও কেক শিল্পে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করে নিজস্ব ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করার। এই লক্ষ্যে অতিসম্প্রতি পরিশ্রমি এই উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন গ্লোবাল বিডি সুগার আর্টিস্ট গিল্ড আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে।
এব্যাপারে ব্যক্তিগতজীবনে অত্যন্ত সদালাপী এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, “দীর্ঘ পেশাগত জীবনের এই পর্যায়ে এসেও সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরিবর্তিত চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতেই নিত্যনতুন ট্রেইনিংয়ে অংশগ্রহন।”এছাড়াও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, “কেক মেকিং, বেকিং ও হ্যান্ডক্রাফটিংয়ের প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। আমি দারুন ভাগ্যবান, নিজের আগ্রহের মাঝেই খুঁজে পেয়েছি ব্যবসায়িক আইডিয়া। তাই স্বপ্ন দেখি, আমার মত অজস্র নারীকে এই শিল্পে সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যেমে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে।”

ব্যাক্তিগতজীবনে রুবিনা রুবি বর্তমানে এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী। ভালোবাসেন পেইন্টিং ও সংগীত। অবসর সময়ে স্বামী ও সন্তানদের সাথে সময় কাটাতেই পছন্দ করেন এবং নিয়মিত ফলো করেন দেশ-বিদেশের কুকিং ও বেকিং স্পেশালিষ্টদের।


আগামীর উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ চাইতেই রুবিনা রুবি বলতে শুরু করেন, “চোখে স্বপ্ন থাকতে হবে। লেগে থাকতে হবে যে কোন কাজে। আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তা হচ্ছে জানতে হবে, শিখতে হবে। জানা ছাড়া, শেখা ছাড়া কোন কিছুই ভাল ভাবে করা সম্ভব নয়।”

তিনি আরও জানান, “ব্যবসার পাশাপাশি সংসারের দেখভাল করতে হয়েছে। তবে ব্যবসা মেয়েদের জন্য খুব কঠিন, এমনটি কখনো মনে হয়নি। চেষ্টা থাকলে যেকোনো নারীই ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্রে সফল হতে পারবেন।’ এসব কথা যখন বলছিলেন, তখন তার মুখে সাফল্যর তৃপ্তির হাসি। বললেন, ‘পরিচিত কোনো মেয়ে যখন চাকরি করার কথা বলেন, আমি তাঁদের উৎসাহ দিই ব্যবসা করো। কারণ, আমাদের একটাই লক্ষ্য, চাকরি করব না, চাকরি দেব।তার মতে কেউ যদি শতভাগ সততার সঙ্গে কাজ করে, সাফল্য তার মুঠোবন্দী হতে বাধ্য।

উপসংহার; ‘দি ট্যুরিজম ভয়েস’ রুবিনা রায়হান রুবীর উত্তরোত্তর মঙ্গল কামনা করে এবং ভবিষ্যতে রুবীর যে কোন কাজের পাশে থাকার প্রানান্তর চেষ্টা করে তার সোনালি স্বপ্নকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছে। রুবিনা রুবির এই এগিয়ে চলার ও সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে পুষ্পিত পল্লবের মত ছড়িয়ে পড়ুক সহস্র নারীর মাঝে।