জলাতল পর্যটনে উন্মোচিত হবে প্রকৃতিক জ্ঞানের সমুদ্র

0
202

জলতল পর্যটন (Underwater Tourism)
মোখলেছুর রহমান

উপক্রমণিকা:
আকাশ বা মহাকাশে উড়া, জল ও মাটিতে ঘুরা এবং জলতলে ডুবার সমন্বয়ে আধুনিক পর্যটন গঠিত। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জলতল পর্যটন মোট পর্যটনের একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। বলাই বাহুল্য যে, জলতল পর্যটন জলাভূমি পর্যটনের একটি রূপ। তাই যেখানে জলাভূমি আছে, সেখানেই জলতল পর্যটন হতে পারে। উল্লেখ্য, সব জলাভূমিই জলতল পর্যটনের জন্য উপযোগী নয়। জলের পরিমাণ, মান ও জলাধারে অবস্থান ও ঋতুকালীন প্রভাব ইত্যাদির উপর তা নির্ভর করে। বাাংলাদেশের ৭০০ নদী-উপনদী, ৩৭৩ হাওর, ৬,৩০০ বিল এবং বাংলাদেশের ৮২% আয়তনের বিশালাকার সমুদ্র হতে পারে জলতল পর্যটনের বহু অনুগন্তব্য। আমাদের নিকটবর্তী দেশসমূহের মধ্যে মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া জলতল পর্যটনে বিশেষ স্থান তৈরি করেছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্তত ১০টি দেশের অর্থনীতি জলতল পর্যটন দিয়ে গড়া। পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এখনই জলতল পর্যটনের প্রায় অর্ধশতাধিক অনুগন্তব্য ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আর সঠিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে তৈরি করা গেলে তার সংখ্যা কয়েক শ হতে পারে। জলতল পর্যটন আমাদের যুবপর্যটনে বিশেষ স্থান দখল করতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে যুবা ও রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করতে পারে। বাংলাদেশের বিশাল জলাভূমিকে জলতল পর্যটনে বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে কার্যকর জলাভূমি সংরক্ষণের পদ্ধতিও উদ্ভাবন করা যেতে পারে।

জলতল পর্যটনের ধারণা:
জলের নিচে পরিচালিত যে কোন ধরণের পর্যটন যেমন নদী, হাওর, নদী, বিল ও সমুদ্রে স্কুবা ডাইভিং, ডুবসাঁতার (Snorkeling) এবং সমুদ্রে কোরাল প্রাচীর (Coral Reef) দর্শন ইত্যাদিসহ জলের নিচে পরিচালিত সাফারি জলতল পর্যটনের আওতাভূক্ত। জলের নিচে ভাস্কর্য নির্মাণ এবং বিভিন্ন ইভেন্ট যেমন সভা, পুরস্কার বিতরণী ও বিয়ের আয়োজন করা যায়। তাই সৃজনশীলতার বিবেচনায় জলতল পর্যটন আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থাপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিচে ৬ (ছয়) ধরণের জলতল পর্যটনের বিবরণ তুলে ধরা হলো:

ক. জলতল পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন: প্রতিটি জলাধার পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়নের এক বিশাল আধার। স্থলভূমির চেয়ে জলাভূমির তলদেশে উদ্ভিদ ও প্রাণির সংখ্যা ও পরিমাণ অনেক বেশি। তাই এর জীববৈচিত্র্য জলবাস্তুকে (Water Ecology) সমৃদ্ধ করে। সমুদ্রবাস্তু (Marine Ecology) আমাদেরকে খাদ্য, ঔষধ প্রস্তুতির কাঁচামাল, পশুখাদ্য, স্থাপনাদ্রব্য, তেল, গ্যাসসহ বহু ধরণের উপাদান সরবরাহ করে। তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষণাকর্মীগণ জলতলের জৈবিক ও ভৌতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়নের জন্য অনূর্ধ ২০ মিটার পর্যন্ত গভীরে ভ্রমণ করে থাকেন। কাপ্তাই হ্রদ, সিলেটের সারি, পিয়াইন ও জাদুকাটা নদী, টাঙ্গুয়ার হাওর, দিনাজপুরের রামসাগর ইত্যাদি জলতল পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়নের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।

খ. কোরাল প্রাচীর (Coral Reef) দর্শন: কোরাল প্রাচীর সামুদ্রিক তলদেশের এক বিশেষ বাস্তু যা কোরাল নামক প্রবালের কলোনি দিয়ে নির্মিত। আমাদের সেন্টমার্টিন্স দ্বীপ অনুরূপ একটি প্রবাল দ্বীপ যার তলদেশে রয়েছে কোরাল প্রাচীরের ভূতাত্তি¡ক গঠন। এই দ্বীপ চুনাপাথর, ঝিনুক-শামুকের খোলস দিয়ে সৃষ্ট কোকুইনা স্তর এবং প্রবাল সৃষ্ট চুনাপাথর দ্বারা গঠিত। ফলে এই দ্বীপের চতুর্দিকে ২০ মিটার নিচ পর্যন্ত প্রবেশ করে কোরালের স্তরে স্তরে বসবাসরত উদ্ভিদ ও প্রাণির মিথজৈবিক অবস্থান এবং জীববৈচিত্র্য দর্শন এক অনুপম পর্যটন। অভিজ্ঞরা বলছেন, এই দ্বীপ এবং এর আশেপাশে আরো অন্তত ৪-৫টি জলতল পর্যটনের অনুগন্তব্য রয়েছে।

স্কুবা ডাইভার

গ. ডুবসাঁতার ভ্রমণ: মুখে সাঁতারের মুখোশ, চোখে চশমা ও শ্বাস-প্রশ্বাস নলসহ পানির নিচে সাঁতরানোকেই ডুবসাঁতার বলে। উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলে ডুবসাঁতার জনপ্রিয় একটি জলতল পর্যটন। স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রায় নাই বলে এইধরণের জলক্রীড়া সব বয়সের মানুষের পছন্দ। আমাদের নদী, বিল, হাওর, সমুদ্র ও আবহাওয়া এর জন্য উত্তম স্থান।

ঘ. ভাস্কর্য দর্শন: সমুদ্র কিংবা গভীর কোন জলাধারের নিচে ভাস্কর্য দর্শন সমসাময়িক জলতল পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যেমন গ্রানাডা সংলগ্ন ক্যারিবীয় সমুদ্রতলে রয়েছে মলিনেয়ার জলতল ভাস্কর্য পার্ক। অন্যদিকে মালদ্বীপের উপকূলীয় অঞ্চলে ভারত মহাসাগরের ১৫০ মিটার তলদেশে স্থাপিত হয়েছে কোরালারিয়াম নামক জলজ ভাস্কর্য। এসব ভাস্কর্য দেখার জন্য পর্যটকরা সমুদ্রের নিচে প্রবেশ করেন। আমাদের সমুদ্রের নিচে অনায়াসে অনুরূপ ভাস্কর্য স্থাপন করা যেতে পারে।

ঙ. জলতল ইভেন্ট: ইতোমধ্যে জলতলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ জলবায়ু দূষণে মালদ্বীপের উপর প্রভাব সৃষ্টির প্রতীকি রূপ প্রকাশ করার জন্য ১৭ অক্টোবর ২০০৯ সালে সমুদ্রের নিচে মন্ত্রীপরিষদ বৈঠক করেন। দুবাইয়ে সমুদ্রতলে নিয়মিতভাবে হাইপোনিক থিম শো, ফ্যনটাসি মারমেইড শো এবং জলতল চিড়িয়াখানা প্রদর্শিত হচ্ছে। এই সকল শো দেখার জন্য প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভিড় করছেন। শুনলে অবাক হতে হয় যে, জলতলে রেস্টুরেন্ট আছে, রিসোর্ট আছে এবং তাতে জন্মদিন ও বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। আমাদের সমুদ্রতলে পার্ক নির্মাণের উদ্দেশ্যে অব্যবহৃত ও ঐতিহাসিকভাবে খ্যঠু একটি জাহাজ কিনে তা পানিতে ডুবিয়ে দিতে পারি ৪-৫ বছরের জন্য। এই সময়ে জাহাজটিতে উদ্ভিদ ও প্রাণিরা নিজেদের আবাস গড়ে তুলবে এবং গড়ে উঠবে একটি জলতল ইকোপার্ক, যা বিশেষ দর্শনীয় স্থাপনায় পরিণত হবে। এই ধারণা বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা জলতল পর্যটনে পৃথিবীতে বিশেষ স্থান দখল করতে পারি।

চ. জলতল এক্যুইরিয়াম: বড় নদী ও সমুদ্রের তলদেশের জীববৈচিত্র্য স্বচক্ষে দেখানোর জন্য জলতল এক্যুইরিয়াম স্থাপন করা হচ্ছে অনেক দেশে। এই সকল স্থাপনা কেবল বিনোদন নয়, বরং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ছাত্র, শিক্ষক ও গবেষকদের অধ্যয়নের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। বাংলাদেশে এই ধরণের এক্যুইরিয়াম স্থাপনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

জলতল পর্যটনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
জলের নিচে পরিচালিত পর্যটনের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রযুক্তিবিদগণ অত্যন্ত সচেতন। একটি স্ট্যান্ডার্ড জাহাজ যতটা নিরাপদ, জলতলের সকল স্থাপনা, যান ও সেবা ততটাই নিরাপদ। ফিজি এবং দুবাইয়ের জলতল হোটেলগুলি নিরাপত্তার জন্য কোরাল রিফে ঘেরা স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে। আবার জলতলে ভ্রমণ নিরাপত্তার কথা ভেবে স্থাপনাগুলি সাধারণত ১৫-২০ মিটারের বেশি গভীরে নির্মাণ করা হয় না। ভ্রমণকারীদের সাথে প্রশিক্ষিত গাইড থাকে এবং সকল কার্যক্রম যথাসম্ভব তীরের কাছাকাছি রাখা হয়। উল্লেখ্য যে, হোটেল নির্মাণ ও পর্যটকদের গমনাগমনে ঐ স্থানের উদ্ভিদ ও প্রাণির ক্ষতি না হয়, সেই বিষয়েও সুদৃষ্টি রয়েছে।

জলতল পর্যটনের জন্য আমাদের করণীয়:
আমাদের প্রথম ও বড় সুবিধা হলো এখনি প্রস্তুত রয়েছে অনেকগুলি জলতল অনুগন্তব্য। কিছু নীতি নির্ধারণী ও ব্যবস্থাপনাগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে সেসব ব্যবহার্য ও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। এতদোদ্দেশ্যে নিচের ৮ (আট)টি কাজ করলে আমাদের দেশে জলতল পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

ক. সর্বাগ্রে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডকে জলতল পর্যটনকে রোমাঞ্চকর পর্যটন (Adventure Tourism) হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় তাত্তি¡ক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণের (Training of Trainers) আয়োজন করতে হবে। কারিকুলাম প্রণয়ন ও প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য সাঁতার, ফটোগ্রাফি, সমুদ্রবিজ্ঞান ও পর্যটনে অভিজ্ঞদের সহযোগিতা গ্রহণ করা যেতে পারে।

খ. নিরাপদ জলতল পর্যটনের উদ্দেশ্যে পর্যটকদেরকে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।

সাগরতলের জীবনযাত্রা

গ. স্কুবাকে জলতল পর্যটনের একটি টুল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর অবদানকে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

ঘ. বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এগিয়ে এসে বিভিন্ন স্থানে যেমন সেন্টমার্টিন্স দ্বীপে, সারি, পিয়াইন ও জাদুকাটা নদী কেন্দ্র করে সিলেটে এবং টাঙ্গুয়ার হাওরাঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে জলতল পর্যটনের কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে। প্রত্যেকে কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পরিমাণ স্কুবা (SCUBA-Self-Contained Underwater Breathing Apparatus) ক্রয় করতে হবে। উল্লেখ্য যে, একেকটি স্কুবা সেটের মূল্য কমবেশি ২০ লক্ষ টাকা। সেই বিবেচনায় প্রতিটি কেন্দ্রে ৫ সেট স্কুবাসহ মোট বিনিয়োগ হতে পারে প্রায় দেড় কোটি টাকার। প্রাথমিকভাবে ৩ বছর মেয়াদি জলতল পর্যটনের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে।

ঙ. কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ের তরুণদেরকে এই রোমঞ্চকর ইকোপর্যটনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কারণ আগামী দিনের পর্যটন এদের হতে হস্তান্তর করতে হবে। অন্যদিকে বিদেশি পর্যটকদের কাছে আমাদের জলতল অনুগন্তব্যসমূহের তথ্য ও তাৎপর্য তুলে ধরে আকৃষ্ট করতে হবে।

চ. বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশের সহায়তায় বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনির্ভাসিটিকে সাথে নিয়ে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

ছ. বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডকে জলতল পর্যটন গবেষণা ও স্কুবা ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।

জ. স্কুবার গুরুত্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, আমলা ও সুশীল সমাজের সদস্যগণকে এর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।

জলতল পর্যটন ও পরিবেশ রক্ষা :
জলাভূমি আমাদের উদ্ভিদ ও প্রাণির আধার এবং খাদ্য ও ঔষধ তৈরির কাঁচামালের প্রধান উৎস। তাই সমুদ্রসহ যে কোন জলাভূমির পরিবেশ নষ্ট হলে তা পার্থিব বিপর্যয় ডেকে আনবে। ফলে পর্যটনকর্মীদেরকে যে কোন নেতিবাচক প্রভাব থেকে জলাধারকে রক্ষা করার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পর্যটনের মাধ্যমে নদী ও সমুদ্রের উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের এবং তাদের বসবাসের পরিবেশের কোন ক্ষতি করা যাবে না। ট্যুরিজম সাবমেরিন থেকে নিঃসৃত বর্জ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পর্যটনের পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে সাথে বাস্তুরক্ষায় অধিক মনযোগী হতে হবে। অন্যথায় একসময় তার জন্য প্রচুর মাশুল দিতে হবে। তাই পরিবেশের ক্ষতি না করে হোটেল বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ এবং পর্যটন পরিচালনা করার উপর বিশেষ তাগিদ সকলের। অন্যদিকে ভূমির নানাবিধ কর্মযজ্ঞও নদী ও সমুদ্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি না করতে পারে, সে বিষয়ে ভূমির পর্যটনকর্মীদেরকে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।

ভবিষ্যতের জলতল পর্যটন:
পর্যটকদের ধর্ম হলো নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে নতুন গন্তব্যের অনুসন্ধান করা। তাই ট্যুর অপারেটররা এই চাহিদা পূরণকল্পে নতুন গন্তব্য ও সুযোগের সন্ধান করে। বিত্তবান পর্যটকরা ভূমি থেকে মহাশূণ্যে অর্থাৎ মহাকাশ পর্যটনে যাবেন এবং বাজেট পর্যটকরা জলে, স্থলে কিংবা জলতল পর্যটনের দিকে ঝুঁকবেন-এটিই স্বাভাবিক। তাই কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে জলতল হোটেল, জলতল রেস্টুরেন্ট এবং জলতল বিনোদনের নানান ব্যবস্থা ইত্যাদি। তাহলে ব্যয় হ্রাস করে অধিক সংখ্যক পর্যটককে জলতল পর্যটনে সেবাদান করা সম্ভব হবে। কারণ আগামী দিনে প্রচুর মানুষ নদী ও সমুদ্রের গভীরে হলিডে কাটানোর জন্য ছুটবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। তাই জলতলের বাস্তুরক্ষার প্রতি নজর দিতে হবে। ইউনেস্কো ভবিষ্যতে জলতল পর্যটনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে গর্ভস্থ প্রাচীন ঐতিহ্য বিনষ্ট হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছে এবং তা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রত্যয়ী হওয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষা করে ভবিষ্যতে জলতল পর্যটন পরিচালনা করতে হবে। এতদোদ্দেশ্যে ভবিষ্যতের জলতল পর্যটনে নিচের আয়োজনগুলি গড়ে তুলতে হবে।

ক. জলতল রিসোর্ট: পানির নিচে ফিজিতে নির্মিত ২৪টি স্যুইটসমৃদ্ধ পসিডন রিসোর্ট এখন বাস্তব। মিনি সাবমেরিন কিংবা স্কুবা ব্যবহার করে এইসকল রিসোর্টে গমন করতে হয়। আগামী দিনে এই ধরণের বহু রিসোর্ট পৃথিবীর বহুদেশে সমুদ্রে কিংবা কোন গভীর জলাভূমিতে নির্মিত হবে। বাংলাদেশের সমূদ্রে, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনা কিংবা সিলেটের সারি ও জাদুকাটা নদীতে এইধরণের রিসোর্ট ভবিষ্যতে নির্মাণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
খ. জলতল সাফারি: পানির নিচে এখনই সাফারি করতে চায় অনেক পর্যটক। যেমন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশসমূহে এবং মালদ্বীপে রয়েছে এই ধরণের সাফারি ব্যবস্থা। আগামী দিনে সারা পৃথিবীর জলাভূমিতে এই সাফারি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। আমাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে জলতল সাফারির আয়োজন করতে হবে ভবিষ্যতে।
গ. জলতল শিল্প প্রদর্শনী: ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইতালির পোনজা সৈকত এলাকায় জলতলে প্রথম শিল্প প্রদর্শনী (অৎঃ ঊীযরনরঃরড়হ) অনুষ্ঠিত হয়। স্কুবা ট্যাঙ্ক ব্যবহার করে দর্শণার্থীরা এই প্রদর্শনী উপভোগ করেন। মেক্সিকোর সমুদ্রতলে রয়েছে ভাস্কর্য পার্ক। স্কুবার সাহায্যে দর্শনার্থীরা এসব দেখছেন তাই আশা করা যায় যে, আগামী দিনে সারা পৃথিবীতে এই ধরণের শিল্প প্রদর্শনীর সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যাবে। এমনকি বাংলাদেশে যদি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে কেন্দ্র করে একটি জলতল ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়, তাহলে তা হবে জলতলে বিশেষ ঐতিহাসিক ভাস্কর্য স্থাপনা।

স্কুবা ডাইভিং

সারকথা:
জলতল পর্যটন আধুনিক পর্যটনের একটি ধারা এবং আমাদের দেশের জন্য নতুন উদ্ভাবন। প্রাকৃতিকভাবে আমরা যে জলসম্পদ পেয়েছি, তার ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার আরেকটি উত্তম পন্থা হতে পারে জলতল পর্যটন। সৃজনশীলতা ও কারিগরি উৎকর্ষ সাধন করতে পারলে এই পর্যটন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেকটি দরজা খুলে দিতে পারে। আমরা জলের বিজ্ঞোচিত ও উত্তম ব্যবহারের আরেকধাপ এগিয়ে যেতে পারি। প্রাকৃতিক মূলধনসমুহকে পর্যটনে বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যটনকে কতমাত্রায় উপস্থাপন করা যায়, তারও একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে জলতল পর্যটন। অন্তর্জলী এই পর্যটন প্রচেষ্টা প্রাকৃতিক জ্ঞানের সমুদ্রকে উন্মোচিত করতে পারে তরুণদের কাছে।