খ্যাতির আড়ালে হারানো কীর্তি যাদের…..( প্রেক্ষাপট পর্যটন ) তৃতীয় পর্ব

0
271

কিশোর রায়হান

প্রারম্ভিকাঃ কোন দেশ বা জাতি (ব্যক্তি) সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে জানতে হয় সেই দেশ বা জাতির (ব্যক্তির) সংস্কৃতি সম্পর্কে। আর ভাষা, পর্যটন ও সাহিত্য, সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়। যুগে যুগে পৃথিবী এমন কিছু মানুষকে পেয়েছে যারা তাদের লেখনীতে যেমনটা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন ও কর্মে করেছেন অনুপ্রাণিত, সেই সাথে তাদের জীবনাচরণের মাধ্যমে অনুপ্রেরণাময় সোনালী ইতিহাস তৈরী করেছেন সংস্কৃতির অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পর্যটনে। যা বর্তমান প্রজন্মের পর্যটকদের জন্য আইডল উদাহরণই বটে। আগের পর্বে আলোচনা করেছিলাম এর্নেস্তো চে গুয়েভারা কে নিয়ে। আজকে যাকে নিয়ে আলোচনা করবো তাকে মূলত আমরা জানি বিদ্রোহী কবি হিসেবে। কিন্তু তার জীবনযাপন ও জীবন দর্শনে জুড়ে আছে সংস্কৃতির বিকাশ ও বিনিময়ের নিদর্শন ,যা পর্যটন সাথে বিশেষ সঙ্গতিপূর্ণ। যা আমাদের মধ্যে ভ্রমণ স্পৃহা তৈরী করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। নজরুল এর ১২১ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তাঁর প্রতি রইলো আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

কাজী নজরুল ইসলাম ( ২৫মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ )

আজকের পৃথিবীতে যখন মানুষ সম্প্রদায় বা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হতে হতে ক্রমশ ছোট হতে বসেছে, শেষ হতে বসেছে সম্প্রীতি, তখন বোধহয় নতুন করে কাজী নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন আমাদের চর্চায়, আমাদের মননে এবং সর্বোপরি জীবন যাপনে। এ-পার ও-পারে এমন দু’জন মানুষ রয়েছেন, যাঁদের নাম প্রায় এক সঙ্গে উচ্চারিত হয়- রবীন্দ্র-নজরুল। এই দু’জন মানুষ বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক এক বিরাট জনগোষ্ঠীকে এক বাঁধনে বেঁধেছেন, বিভক্ত দেশের সব সীমারেখা মুছে দিয়ে। বলা চলে বাঙালির সংস্কৃতিকে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম। কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি কবি এবং পরবর্তী কালে বাংলাদেশের জাতীয় কবি। অনেকে হয়তো বলবেন নজরুলের জীবন তো গান কবিতা আর জেলখানাতে কেটেছে। এর সাথে পর্যটনের সম্পর্ক কি? এবার চোখ রাখা যাক নজরুলের বর্ণাঢ্য জীবনের দিকে। যা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে নজরুলের ভ্রমণ ও তাঁর স্মৃতিচিন্হ সমূহ আমাদের পর্যটন ক্ষেত্র হিসেবে কতটা গুরুত্ব বহন করে।

তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি ও দার্শনিক। তিনি বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তার কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। নজরুল প্রায় ৪,০০০ গান (গ্রামোফোন রেকর্ড সহ), সংগীত রচনা ও সুর করেছিলেন। ধর্মীয় বৈষম্য ও লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল। এর পাশাপাশি তিনি কালী দেবিকে নিয়ে অনেক শ্যামা সঙ্গিত রচনা করেন। নজরুল তার শেষ ভাষনে উল্লেখ্য করেন – “কেউ বলেন আমার বানী যবন কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে, গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।” একবার ভাবুন তো এরকম একটি অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষ যেকোনো জাতি বা সমাজের সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন? আমরা সকলেই জানি পর্যটন সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, নজরুল এর দর্শন পর্যালোচনা করলে আমরা তার বর্ণাঢ্য জীবনে তার যথেষ্ঠ প্রতিফলন দেখতে পাই ।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল “দুখু মিয়া”। নজরুল গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে তার পিতার মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাত্র দশ বছর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজে নামতে হয় তাকে। এসময় নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে হাজি পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াযযিন হিসেবে কাজ শুরু করেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান যা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যকর্মে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তিনিই বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চেতনার চর্চা শুরু করেছেন বলা যায়। মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে নজরুল বেশি দিন ছিলেন না। বাল্য বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল) দলে যোগ দেন। লেটো দলেই তাঁর সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। এই দলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতেন, তাদের সাথে অভিনয় শিখতেন এবং তাদের নাটকের জন্য গান ও কবিতা লিখতেন। ১৯১০ সালে নজরুল লেটো দল ছেড়ে ছাত্র জীবনে ফিরে আসেন। এই নতুন ছাত্রজীবনে তার প্রথম স্কুল ছিল রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল, এরপর ভর্তি হন মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে যা পরবর্তীতে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি লাভ করে।

যাহোক, আর্থিক সমস্যা তাকে বেশ দিন এখানে পড়াশোনা করতে দেয়নি। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তাকে আবার কাজে ফিরে যেতে হয়। প্রথমে যোগ দেন বাসুদেবের কবিদলে। এর পর একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা এবং সবশেষে আসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন। এভাবে বেশ কষ্টের মাঝেই তার বাল্য জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। পরবর্তীতে দোকানে কাজ করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহ’র সাথে তার পরিচয় হয়। তিনিই নজরুলকে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আবার রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণী থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেণ্টে সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে মেসোপটেমিয়ায় যান। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক কর্পোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন। বলা যায় নজরুলের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি এই করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। এরপর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের দিকে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে গ্রন্থ প্রকাশক “আলী আকবর খানের” সাথে পরিচিত হন। তার সাথেই তিনি প্রথম কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সাথে যার সাথে তার প্রথমে প্রণয় ও পরে বিয়ে হয়েছিল। তবে এর আগে নজরুলের বিয়ে ঠিক হয় আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের সাথে। বিয়ের আকদ সম্পন্ন হবার পরে কাবিনে, নজরুলের ঘর জামাই থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধ বাধে। নজরুল ঘর জামাই থাকতে অস্বীকার করেন এবং বাসর সম্পন্ন হবার আগেই নার্গিসকে রেখে কুমিল্লা শহরে বিরজা সুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান। তখন নজরুল খুব অসুস্থ ছিলেন এবং প্রমিলা দেবী নজরুলের পরিচর্যা করেন। এক পর্যায়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

নজরুল সাম্যবাদের একজন অগ্রদূত ছিলেন। তিনি মুসলিম হয়েও চার সন্তানের নাম বাংলা এবং আরবি/ফারসি উভয় ভাষাতেই নামকরণ করেন। যেমন: কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ |

বর্ণাঢ্য সৈনিক জীবন ত্যাগ করে নজরুল বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে মুজফ্ফর আহমদের সাথে বাস করছিলেন। মুজফ্ফর আহমদ ছিলেন এদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত। এখান থেকেই তাই নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ শুরু হয়। এ সময় থেকেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সাথে পরিচিত হন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তখন মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন এবং মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন চলছিলো- নজরুল এই দুটি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা তথা স্বরাজ অর্জনে বিশ্বাস করতেন যা মহাত্মা গান্ধীর দর্শনের বিপরীত ছিল। আবার মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কের সালতানাত উচ্ছেদের মাধ্যমে নতুন তুরস্ক গড়ে তোলার আন্দোলনের প্রতি নজরুলের সমর্থন ছিল। তারপরও তিনি অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তবে সব দিক বিচারে নজরুল তার রাষ্ট্রীয় ধ্যান ধারণায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন কামাল পাশার দ্বারা। নজরুল ভেবেছিলেন তুরস্কের মুসলমানরা তাদের দেশে যা করতে পেরেছে ভারতীয় উপমহাদেশে কেন তা সম্ভব হবে না? আর তার এই অবস্থানের পিছনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল কামাল পাশার। সে হিসেবে তার জীবনের নায়ক ছিলেন কামাল পাশা। নজরুলও তার বিদ্রোহী জীবনে অনুরূপ ভূমিকা পালনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। উল্লেখ্য ১৯২১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে মুজফ্ফর আহমদ ও নজরুল তালতলা লেনের যে বাসায় ছিলেন সে বাড়িতেই ভারতের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হয়েছিল। ১৯২০ এর দশকের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণের চেষ্টা করেন। প্রথমে কংগ্রেসে সমর্থন লাভের জন্য তিনি কলকাতা যান। কিন্তু কংগ্রেসের কাছ থেকে তেমন সাড়া না পেয়ে তিনি একাই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। নির্বাচনে তিনি তেমন সাফল্য পান নি। এরপর সাহিত্যের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ অব্যাহত থাকলেও রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ কমে যায়।

নজরুল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করার পরে কলকাতায় নিজেকে সাংবাদিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি ভারতে ব্রিটিশ রাজকে আক্রমণ করেছিলেন তার লেখনী দিয়ে এবং বিদ্রোহী এবং ভাঙ্গার গান এর মতো তাঁর কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে বিপ্লব প্রচার করেছিলেন, পাশাপাশি তাঁর প্রকাশনা ধূমকেতু । ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর জাতীয়তাবাদী তৎপরতা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দ্বারা প্রায়শই তাকে কারাবাসের দিকে পরিচালিত করে। কারাগারে থাকাকালে নজরুল লিখেছিলেন রাজবন্দীর জবানবন্দী। তাঁর কবিতা ও সংগীত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিকে তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট কলকাতার ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট থেকে নজরুল অর্ধ সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর পরে ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ধূমকেতু’তে প্রকাশিত হল নজরুলের ৭৯ লাইনের কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। ওই কবিতার জন্য নজরুলের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। নজরুল সেই সময় কুমিল্লায়। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর দুপুরে সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করে ২৪ নভেম্বর কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ (ক) ধারায় কবিকে রাজদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় এবং বিচারের শুনানি শুরু হয় কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইন-হো’র আদালতে। ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার রায় বেরোয়। সেখানে নজরুলের এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। পরের দিন, ১৭ জানুয়ারি প্রেসিডেন্সি জেল থেকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, সেখান থেকে হুগলি জেল হয়ে কবিকে বহরমপুর ডিস্ট্রিক্ট জেলে নিয়ে আসা হয় ১৯২৩ সালের ১৮ জুন।- ১৯২২ সালের ২৫ নভেম্বর কোমরে দড়ি ও হাতে হাতকড়া পরিয়ে কবিকে এজলাসে হাজির করা হলে, ২৯শে নভেম্বর শুনানির দিন ধার্য করা হয়। নজরুলের পক্ষ সমর্থন করে সলিল মুখোপাধ্যায়-সহ বেশ কয়েক জন আইনজীবি এগিয়ে আসেন। ১৯২৩ সালের ৭ই জানুয়ারি রবিবার দুপুরে প্রেসিডেন্সি জেলে বসে আত্মপক্ষ সমর্থনে রচনা করেন, ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। ৮ জানুয়ারি তা কোর্টে পেশ করা হয়। আদালতে কবির সেই জবানবন্দী সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে থাকলেও তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জেলে থাকাকালীন মুজফফর আহমদকে গোপনে লেখা একটা চিঠিতে রয়েছে, বহরমপুর জেলে তাঁর ভাল থাকার কথা। সে সময় বহরমপুর জেলের সুপার ছিলেন বসন্ত ভৌমিক। নজরুলের প্রতি তাঁর মনে যথেষ্ট সহানুভূতি ছিল। তিনি নজরুলকে একটা হারমোনিয়াম জোগাড় করে দিলেন। এ দিকে গানের সঙ্গে কবিতা লেখাও চলছে। তাঁর সব লেখাই গোপনে চলে যাচ্ছে বাইরে। ‘প্রবাসী’র সম্পাদক নজরুলের ছোট বড় যে কোনও কবিতার জন্য দশ টাকা দিয়ে তাঁকে উৎসাহিত করতে লাগলেন।
উল্লেখ্য, সে সময় একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কেউই কবিতার জন্য টাকা পেতেন না। এরই মধ্যে আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে ওই সালের সেপ্টেম্বর মাসে বের হল নজরুলের ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যগ্রন্থ। তবে বহরমপুর জেলের জীবন একেবারে নিষ্কন্টক ছিল না। প্রিজন অ্যাক্ট ভাঙার অপরাধে নজরুলের বিরুদ্ধে এখানেই আবার একটা মামলা হল। ওই বছরেরই ১০ ডিসেম্বর তাঁকে হাজির করা হল বহরমপুরের সাব-ডিভিসনাল ম্যাজিস্ট্রেট এন. কে. সেনের আদালতে। এ দিন বহরমপুর কবির পাশে দাঁড়িয়ে অনন্য নজির স্থাপন করল। ব্রজভূষন গুপ্তের নেতৃত্বে শহরের হিন্দু মুসলমান উকিলেরা কবির হয়ে লড়াই করেন । পুলিশের অনুরোধে ১৪ ডিসেম্বর পরবর্তী মোকদ্দমার দিন পড়ল। কিন্তু সে মোকদ্দমা ১০ তারিখের কথা মনে করেই হোক বা অন্য কোনও কারণেই হোক সরকার আর চালিয়ে নিয়ে যেতে চাইল না। আর বহরমপুরের মানুষ কবির কারাবাস কালে তাঁর পাশে থাকতে পেরে, কারাবসানে তাঁকে সংবর্ধিত করতে পেরে হয়েছিল ধন্য। সেদিনের সেই ঘটনা এই মফস্বল শহরে আজও, প্রায় শতবর্ষ পরেও কিন্তু রয়ে গেছে এক টুকরো গর্বের ইতিহাস হয়ে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বহরমপুর ডিস্ট্রিক্ট জেলে প্রায় ছ’মাস কারাবন্দি ছিলেন। বর্তমানে সেটি বহরমপুর মানসিক হাসপাতাল। যদিও নজরুলের স্মৃতিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক সময়ে ওই ঘরটিকে ‘নজরুল ওয়ার্ড’ নামে চিহ্নিত করেন। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত সেই ঘর এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একটি ঘরে কাজী নজরুল ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দি ছিলেন। নজরুলের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কিন্তু সরকারি স্তরে কোনও সংগ্রহশালা গড়ে ওঠেনি, এটা আক্ষেপের বিষয়। চোরের নজরে কবির মূর্তিও ছিলো! আসানসোল পুরসভার তত্ত্বাবধানে থাকা কুলটির নিয়ামতপুরের একটি উদ্যান থেকে কাজী নজরুল ইসলামের মূর্তি উধাও হয়ে গিয়েছিলো। ১৯৯৮-র ডিসেম্বরে আসানসোল পুরসভার ৬১ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়ামতপুর জিটি রোড লাগোয়া এলাকায় নজরুল উদ্যানটি তৈরি হয়েছিল। সেখানেই ছিল নজরুলের মূর্তিটি।

পুলিশ এসেছিলো ‘ধূমকেতু’ অফিসে তালাশির পরওয়ানা ও কাজী নজরুল ইস্লামের নামে গ্রেফতারি পরওয়ানা নিয়ে। নজরুল তখন সমস্তিপুরে গিয়েছিল বলে গ্রেফতার হননি। ৭এ এবং ৭বি প্রতাপ চ্যাটার্জি লেনের সেই বাড়ি, সেই সিঁড়ি এখনও রয়েছে একই ভাবে। ‘৭ নম্বর প্রতাপ চ্যাটার্জি লেনের দোতলায় তিনটি খুব বড় বড় সেই ঘরগুলিও রয়েছে। শুধু পাল্টে গিয়েছে আবহ। বাড়িটি ঘিরে নজরুলের যে স্মৃতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, যে বাড়ি থেকে নজরুল ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার বেশ কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন, সেই বাড়িটির সংরক্ষণে সরকারি তরফে যথাযথ ভূমিকা দেখা যায়নি। বর্তমানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ওই বাড়ি প্রায় ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। আবার বাড়িটির মালিকপক্ষের বক্তব্য, ওই বাড়িটি যে হেরিটেজ, তা জানা গিয়েছে বাড়িটি কেনার পরে! ইতিহাসের একটি সূত্র বলছে, প্রথমে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটি ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট থেকে বের হলেও পরবর্তীকালে সেটি প্রতাপ চ্যাটার্জি লেনের ওই বাড়িটি থেকেই প্রকাশিত হয়।

কবিতা লিখে ব্রিটিশদের রোষে পড়ে জেলে গিয়েছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় আদর্শ। মেদিনীপুরবাসী তাঁকে সম্বর্ধনা দেয়। মেদিনীপুর কলেজে ১৯২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি সভা হয়েছিলো । দুপুরবেলায় আয়োজিত সেই সভার অন্য একটি বৈশিষ্ট্যও ছিল, শহরের বিভিন্ন বয়সি মেয়েরা সেই সম্বর্ধনা সভার আয়োজক ছিলেন। তরুণ কবি সেই সভায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। বাবরি চুল দুলিয়ে কবির ওজস্বী কণ্ঠের আহ্বান, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়’। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ মেদিনীপুর শাখার আমন্ত্রণে সম্বর্ধনা নিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি শহরে এসেছিলেন কবি। এর একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। একদিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জ্বালাময়ী ইংরেজ বিরোধী ভাষণ অন্যদিকে নজরুলের উত্তেজনাপূর্ণ গান কবিতা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা দিয়েছিলো। ১৭ জানুয়ারি কবিকে আনা হয় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। নজরুলের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। ১৯২২ সালে ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশের পর ২২০০ কপি নিঃশেষ হয়ে যায় এক বছরে। যা বাংলা কবিতার জগতে অনন্য নজির। রবীন্দ্রনাথ তরুণ কবির প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানালেন। ‘বসন্ত’ নাটিকা নজরুলকে উৎসর্গ করলেন। জেলখানায় বসে কবির নিজের হাতের লেখা-সহ ‘বসন্ত’ উপহার পেয়ে নজরুল আনন্দে আত্মহারা। ১৪ এপ্রিল নজরুলকে আনা হয় হুগলি জেলে। রাজবন্দিদের প্রতি জেল অধ্যক্ষের অমার্জিত আচরণের প্রতিবাদে যুবক কবি শুরু করলেন অনশন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ-সহ তৎকালীন সময়ের প্রায় সকল খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের অনুরোধ সত্ত্বেও কারা কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানে আগ্রহ দেখাননি। অনশনের ৪০ দিনে রবীন্দ্রনাথের হস্তক্ষেপে জেল কর্তৃপক্ষ রাজবন্দিদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। নজরুল অনশন ভাঙেন মাতৃসমা বিরজা সুন্দরীর হাতে লেবুজল খেয়ে। ১৮ জুন কবিকে আনা হয় বহরমপুর জেলে। তিনি মুক্তি পান ১৫ ডিসেম্বর। বন্ধুবান্ধবেরা ঠিক করেছিলেন, কাজীকে সম্বর্ধনা দেবেন। কবিবন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘মেদিনীপুরেই প্রথম কাজীকে বিপুলভাবে সম্বর্ধিত করা হয়। তারপর বাংলাদেশের অন্যান্য জেলা, মহকুমা পল্লী তাঁকে অভিনন্দিত করে।’’

মেদিনীপুরবাসীর ভালবাসা, তাঁদের জাতীয়তাবাদী চেতনা নজরুলের মনকে কতখানি ছুঁয়ে গিয়েছিল তার প্রমাণ আছে পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘ভাঙার গান’-এর উৎসর্গ পত্রে। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন নজরুল। কবি পরিবার পড়েন আর্থিক অনটনে। আবার পাশে দাঁড়ায় মেদিনীপুর। মেদিনীপুর কলেজের ছাত্র সংসদের অধীন ‘রবীন্দ্র শরৎ বঙ্কিম পরিষদ’-এর উদ্যোগে ২৪ অগস্ট ১৯৪৮ সালে ডায়মন্ড গ্রাউন্ডে (এখন অরবিন্দ স্টেডিয়াম) প্রদর্শনী ফুটবল খেলার আয়োজন করা হয়। খেলায় অংশ নিয়েছিল মেদিনীপুর কলেজ একাদশ বনাম কাঁথি কলেজ একাদশ। চ্যারিটি ম্যাচের টিকিট বিক্রি ও ডোনেশান কার্ড থেকে পাওয়া ৩২৮.৬২ টাকা আজহারউদ্দীন খান ও আর একজন ছাত্র কবিপত্নীর হাতে দিয়ে আসেন ২৮ আগস্ট। এর পরেও আরেকবার মেদিনীপুর শহরে এসেছিলেন নজরুল ১৯২৯ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি। কিন্তু প্রথম মেদিনীপুর সফরের সঙ্গে একটি দুঃখজনক ঘটনার যোগ রয়েছে। মেয়েরা যে সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করেছিলেন তার শেষে এক শিক্ষক কন্যা তরুণী কমলা দাস গান শুনে নিজের গলার হারটি পরিয়ে দেন কবিকণ্ঠে। একান্তই ভক্তি এবং আবেগ থেকে কাজটি করেছিলেন কমলা। কিন্তু সামাজিক গঞ্জনা থেকে বাঁচতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কমলা আত্মহত্যা করেন।
গোলাম মুরশিদের গবেষণা-সন্দর্ভ ও রচনায় লিখেছেন, ‘‘কবি (নজরুল) এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো হাতে টাকা থাকলে তা উড়িয়ে দিতে দ্বিধা করতেন না। বিলাসিতা করতে ভালোবাসতেন। নিজেকে জাহির করতে পছন্দ করতেন।’’ তাঁর নজরুল-জীবনী কেবল যেন জীবনকথা নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক রাজনীতির ইতিকথা। স্বাধীনতার ঠিক পরেই পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে পাঠ্যসূচিতে নজরুলের লেখা অবহেলিত বলে মনে হয়েছে মুরশিদের। নজরুলকে গ্রহণ-বর্জনের সাংস্কৃতিক ইতিহাসটি যেমন পাঠকের আগ্রহের কারণ তেমনই পাঠকের কৌতূহলের বিষয় তাঁর প্রণয় জীবন। নজরুলের জীবনে একাধিক নারীর উপস্থিতি। স্কুলজীবনের কিশোরী, নার্গিস, আশালতা, ফজিলতুন্নেসা আরও কেউ কেউ। এই নারীদের মধ্যে কী খুঁজেছেন কবি? প্রিয়ার কাছে প্রেরণাই কি চেয়েছেন শুধু? নজরুল ও ফজিলতুন্নেসার সম্পর্কটি বঙ্গজীবনে নতুন নারীর আগমনের ছবি যেন। ফজিলতুন্নেসা নারীমুক্তিতে বিশ্বাসী। ‘‘যে শিক্ষা নারী জীবনের পূর্ণ পাত্রের রস আস্বাদনে সাহায্য করেছে, সে শিক্ষাকে আমার জীবনে আমি বড় করেই পেয়েছি’’ লিখেছিলেন তিনি। নজরুল তাঁর সঞ্চিতা ‘বাংলার মুসলিম নারীদের রাণী’কে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। ফজিলতুন্নেসা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত চলে যান।

সরস্বতী পুজোর উদ্বোধন করবেন কাজী নজরুল ইসলাম। চন্দননগরের প্রাচীন ক্লাব ‘সন্তান সংঘ’-র আমন্ত্রণকে উপেক্ষা করেননি তিনি। এই উপলক্ষে নজরুল স্বরচিত কবিতা ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ পাঠ করেছিলেন। নজরুল রচনাসম্ভার জানাচ্ছে, কবিতাটির রচনাস্থান হুগলি। কবিকণ্ঠে কবিতাটির প্রথম পাঠস্থান চন্দননগর। পরে ১৯৪৫ সালে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, সবুজ দ্বীপ আন্দামান আর সেলুলার জেলের বন্দিদের মুক্ত করেছিলেন নেতাজি সুভাষ, নজরুলের কথায়— ‘পূজারি, কাহারে দাও অঞ্জলি?/মুক্ত ভারতী ভারতে কই?’
আজ যখন দিকে দিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, কিছু মানুষ প্রশ্রয় দিচ্ছেন ধর্মান্ধতাকে, তখন এক বন্ধুত্বের কাহিনি শোনাই। ১৯১০-১১ সালে বন্ধুত্ব হয়েছিল রায়সাহেব মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের নাতি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও চুরুলিয়ার সম্ভ্রান্ত বংশীয়, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান কাজী নজরুলের। নজরুল চুরুলিয়া ছেড়ে রানিগঞ্জের সিহারসোলের রাজ স্কুলে আর শৈলজানন্দ রানিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলেন। সেখানেই দু’জনের গভীর বন্ধুত্বের সূচনা এবং আমৃত্যু শৈলজানন্দ সেই বন্ধুত্বকে এত সম্মান করতেন, যা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। দুই সাহিত্যিকই কিশোর বয়স থেকে তাঁদের জীবনের বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন অন্ডাল গ্রামে। এই গ্রামের পুকুরে শৈলজানন্দ নজরুলকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন। যে ঘরে দুই বন্ধু নজরুল ও শৈলজানন্দ দিনের পরে দিন থাকতেন, সেই ঘর এখনও ভাঙা পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। নজরুল ও শৈলজানন্দের এই গভীর এবং অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে, এমনকী, সমগ্র ভারতবর্ষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক দৃষ্টান্ত। দুঃখের বিষয়, মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক এই দুই মনীষীর স্মৃতিবিজড়িত কর্মকাণ্ড আজও আমাদের অজানা। নতুন প্রজন্মের বাঙালিদের একটা বড় অংশ এঁদের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না। অনেকে এ বিষয়ে উদাসীন। শৈলজানন্দ বলতেন, মানুষকে ভালবেসেই তাঁর সাহিত্যের অঙ্গনে আগমন। আর, নজরুল তো বলেছেন, ‘মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’।

১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে নজরুল শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাস থেকে ছবি বানিয়েছিলেন নরেশচন্দ্র মিত্র। ‘দেবদত্ত ফিল্ম’-এর প্রযোজনায় তা মুক্তি পায় ১৯৩৮-এর ৩০ জুলাই। ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাতে বাধা কম আসেনি। ছবি মুক্তির আগে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, তা দেখে বিশ্বভারতী মিউজ়িক বোর্ড আপত্তি তুলেছিল । পরিচালক ভেবেছিলেন, স্বয়ং নজরুল যেখানে সঙ্গীত পরিচালক, সেখানে রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই কোনও আপত্তি করবেন না। তাই আর অনুমতি নেওয়ার কথা ভাবেননি। ‘গোরা’ ছবির প্রিন্ট আর একটা ছোট প্রজেক্টর সঙ্গে করে, গাড়ি নিয়ে নজরুল সোজা রবীন্দ্রনাথের কাছে শান্তিনিকেতনে হাজির। নজরুলকে দেখে তো কবি মহাখুশি। নজরুল ছবি সংক্রান্ত সমস্যার কথা খুলে বললেন কবিকে। বাঁধন সেনগুপ্ত ‘রবীন্দ্রনাথের চোখে নজরুল’ রচনায় লিখেছেন, সব শুনে কবি রীতিমতো বিস্মিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে নজরুলকে বলেছিলেন, ‘‘কী কাণ্ড বলতো? তুমি শিখিয়েছ আমার গান আর ওরা কোন আক্কেলে তার দোষ ধরেন? তোমার চেয়েও আমার গান কি তারা বেশী বুঝবে! আমার গানের মর্যাদা ওরা বেশী দিতে পারবে?’’ কবির মন্তব্য শুনে নজরুল আশ্বস্ত হলেন। বললেন, তবু কবির লিখিত অনুমতি দরকার, নইলে ছবি মুক্তি পাবে না। তিনি ছবির প্রিন্ট ও প্রজেক্টর নিয়ে এসেছেন, রবীন্দ্রনাথ ছবি দেখে যা লেখার লিখে দিন। শুনে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‘ছবি দেখাতে চাও সকলকেই দেখাও, সবাই আনন্দ পাবে। আপাতত দাও কিসে সই করতে হবে।’’ আর কিসের বাধা! ‘গোরা’ মুক্তি পেল কলকাতার ‘চিত্রা’ (পরে ‘মিত্রা’) প্রেক্ষাগৃহে। ছবিতে মোট পাঁচটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করেছিলেন নজরুল। ছবির একটি রোম্যান্টিক দৃশ্যে নিজের লেখা একটি গানও ব্যবহার করেছিলেন নজরুল।

সাহিত্য সাধক এম আব্দুর রহমান স্মৃতিচারণা করতেন নজরুল ইসলামকে নিয়ে। গণবাণী অফিসে আলাপ হওয়ার সময়েই বিদ্রোহী কবি তাঁকে বলেছিলেন, গ্রামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে। কারণ বইপত্রের মাধ্যমেই একটি জাতির আত্মিক উন্নতির সম্ভব। যুবক রহমান কবিকে বলেন, তাহলে আপনিই প্রথমে লাইবেরির জন্য কিছু বই দিন। নজরুল ইসলাম কিছু বই উপহার দিলেন। সাহিত্যচর্চা চলতে থাকল। রহমান এর ভাষ্যে “জ্যৈ ষ্ঠ মাস এলেই আমরা দূরদর্শনে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে নানান অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায় মেতে উঠতাম। ১১ জ্যৈষ্ঠ তাঁর জন্মদিন। অল্প বয়সে নজরুলের জন্মদিনে কবির ক্রিস্টোফার রোডের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পায়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতাম।“ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুল অনেক বেশি গান লিখেছেন বলে বলা হয়। ঠিক সংখ্যা কত? অরুণ বসু থেকে জানা যায়, নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবন ১৯২০ থেকে ১৯৪২, মাত্র বাইশ বছরের। সংগীত সৃষ্টির কাল মাত্র এগারো-বারো বছরের। এক বার সাহিত্যসংস্কৃতি অনুষ্ঠানে আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক শিশির কর জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত নজরুলের বইয়ের কথা।
সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েও নজরুল তাঁর সৃষ্টির কাজে অনড় থাকেন । রবীন্দ্রদর্শন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইলেও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কিন্তু নজরুলকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। আবার রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর অন্তরের আকর্ষণ অনুভব করা যায় তাঁর অগ্নিবীণা কাব্যের নামকরণটি দেখে। কারণ রবিঠাকুরের একটি গানই এর প্রেরণা— ‘অগ্নিবীণা বাজাও তুমি কেমন করে’। প্রাণের আবেগে ভরা তরুণ কবি নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত (১৯২৩) নাটকটি উৎসর্গ করেছিলেন। অথচ নজরুল ছিলেন কল্লোলীয় কবি। যাঁদের মূল লক্ষ্যই ছিল রবীন্দ্র বিরোধিতা। ‘বসন্ত’র একটি কপিতে নিজের নামটি লিখে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‘তাকে বোলো, আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না বলে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে আমার সমগ্র অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বোলো, কবিতা লেখা যেন কোনো কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জাগাবার কবিও তো চাই।’’ নতুন করে বলবার অপেক্ষা রাখে না সেই সৃষ্টি সুখের উল্লাসে যিনি মেতেছিলেন তিনি ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম।

অটলবিহারী বাজপেয়ী চুরুলিয়ায় এসে কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভিটেতে ঢোকার আগে মাটিতে হাত ছুঁইয়ে প্রণাম করেছিলেন। তখন তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। তখন দেশের যুবকল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মাধ্যমেই কাজী নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যেরা প্রধানমন্ত্রীকে চুরুলিয়ায় আমন্ত্রণ জানান। নজরুল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল বলেন, ‘‘শুনেছিলাম, এক বার শুনেই তিনি চুরুলিয়ায় আসতে সম্মত হয়েছিলেন।’’ জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁর গাড়ির কনভয় কবির জন্মভিটের বেশ কিছুটা আগেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তিনি হেঁটে যান কবির ভিটেতে। সেখানে করজোড়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। নজরুলের জন্মদিন ২৫ মে। এই উপলক্ষে কবির লেখা ২২টি গান-কবিতা হিন্দিতে অনুবাদ করে সারা দেশে প্রচার করে আরএসএস সংঘ। আরএসএস সংঘের এক নেতার অবশ্য বক্তব্য, ‘‘জাতীয়তাবাদী মানুষ যে ধর্মেরই হোন না কেন, তাঁদের আরএসএসের কাজে যুক্ত করা হতে পারে। এর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নেই।’’ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দলে নির্দেশ দিয়েছিলেন, পাড়ায় পাড়ায় নজরুল জয়ন্তী পালন করতে হবে। নজরুলের জীবনী এবং গান-কবিতা সংবলিত ট্যাবলো নিয়ে প্রভাতফেরী ও সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দলীয় কর্মীদের নজরুল স্মরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন মমতা।

চুরুলিয়া ঘেঁষে আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন রাজ্য সরকারের অন্যতম উদ্যোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সঙ্গেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘নজরুল সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিস, তারা কাজের ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায় নজরুলের অনুবাদে। ইংরেজি ও নেপালি ভাষায় অনুবাদের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। হিন্দি, উর্দু, সিন্ধি ছাড়া অন্য ভারতীয় ভাষায় অনুবাদের কাজও শুরু হবে। নজরুলের মানবতার দর্শনে ভাষা ও সংস্কৃতির বহুত্বের দিকগুলি নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ চলছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় অবস্থিত ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’এর সঙ্গে একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে গবেষণা ও প্রকাশনার কাজ যুগ্মভাবে করার বিষয়ে। নজরুলের চিন্তা, চেতনা ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে নিয়মিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করে এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে নজরুলগীতির স্নাতক স্তরের পাঠ্যক্রম। বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা নথিভুক্ত হয়েছেন এই পাঠ্যক্রমে। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কবিতীর্থ চুরুলিয়ার নজরুল অ্যাকাডেমির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় তথা সেন্টার ফর সোশ্যাল স্টাডিস এক যোগে প্রতি বছর নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে মে-তে আয়োজন করে সপ্তাহব্যাপী নজরুল মেলা। চুরুলিয়াকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সাধারণ মানুষের যোগদানকে নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে অদূর ভবিষ্যতে।

১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদক নজরুলকে প্রদান করা হয়। ১৯৬০ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে ভূষিত করা হয়। বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি. লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনও বড় যন্ত্রণাময় ছিল কবির। ১৯২৪ সালে তাঁর বিয়ে হয় প্রমীলা সেনগুপ্তের সঙ্গে। সস্ত্রীক হুগলিতেই বাস করতে থাকলেন। তখন থেকেই সক্রিয় ভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়া, গঠিত হয় স্বরাজপার্টি । ইতিমধ্যে দুই পুত্রসন্তানের অকালমৃত্যু কবিকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে। আবার ১৯৪০ সালে স্ত্রী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। ১৯৪২ সালে কবি নিজেও দুরারোগ্য পিক্সরোগে আক্রান্ত হন। । যাতে ক্রমশ তাঁর মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা চলে যায়, তিনি সৃষ্টির দুনিয়া থেকে নির্বাসিত হন। প্রায়শই বলা হয়, কারণটি ব্রিটিশ সরকার ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া করেছিল কিন্তু পরে ভিয়েনার একটি মেডিকেল দল এই রোগটি “মরবাস পিক” হিসাবে চিহ্নিত করেছিল, একটি বিরল অসমর্থ নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ। কিন্তু এরই মধ্যে তাঁর সৃষ্টি সম্ভারের প্রাচুর্য দেখলে অবাক হতে হয়।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের শেষ জীবনে বেশ কয়েক বছর তাঁর সেবক-সঙ্গী ছিলেন বীরভূমের দুলাল শেখ। বস্তুত, দমদম বিমানবন্দের, কবির বিমানে ওঠার সময়কার অদ্ভুত এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে ছিলেন দুলাল। নজরুলের পুত্রবধূ উমা কাজী আর দুলাল নিজে কবিকে ধরে ধরে সিঁড়ি বেয়ে তুলছিলেন বিমানে। মাঝপথে হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন কবি। সিঁড়ির উপর থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে গভীর মনোযোগে দেখতে থাকলেন চারপাশ। এক-দেড় মিনিট তো হবেই। দুলালের স্পষ্ট মনে আছে, কবির চোখ দু’টি যেন সজল হয়ে উঠছিল তখন। উমা কাজী একটু নেমে এসে পুনরায় শিশুর মতো কবির হাত ধরে বুঝিয়ে উপরে তুলেছিলেন। ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পরে মানুষের সেই উন্মাদনার ছবি চোখে ভাসে দুলালের। লোকে লোকারণ্য চারপাশ। মেলা-খেলাতেও কোনও দিন এত লোক দেখেননি দুলাল। গাছের উপরেও লোকজন উঠেছে কবিকে একটি বার দেখার জন্য। তাঁদেরকে ধানমণ্ডি রোডের ‘কবিভবনে’ নিয়ে যাওয়া হল। সেখানেই সরকারি তত্ত্বাবধানে কবি-সহ পরিবারের সকলের থাকার সুপরিকল্পিত আয়োজন করা ছিল। কবির দর্শনপ্রত্যাশীদের সামলাতে পুলিশও হিমশিম খেয়ে যেত। প্রতিদিনের জমা ফুলের তোড়ায় একটা বড় ঘর ভর্তি হয়ে যেত, কবিভবনে সর্বক্ষণের জন্য পুলিশ মোতায়েন থাকত। সরকারের তরফ থেকে মোটরগাড়িও দেওয়া হয়েছিল। হুডখোলা গাড়িতে করে সপ্তাহান্তরে কবিকে বাইরে বেড়াতে নিয়েও যাওয়া হত। মেডিক্যাল কলেজ থেকে মিলিতা ও মনজু নামের নার্সকে সকাল ন’টায় গাড়ি এসে রেখে যেত, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে চিকিৎসক এন চৌধুরী সপ্তাহে দু’দিন আসতেন কবির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। কবিকে গান শোনানোর জন্য বাংলাদেশ বেতার থেকেও প্রতিদিন শিল্পীরা আসতেন।

কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারী আদেশ জারী করা হয়। ১৯৭৬ সালে নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার জানাজার নামাজে ১০ হাজারেরও অধিক মানুষ অংশ নেয়। জানাজা নামায আদায়ের পরে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান, এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, মেজর জেনারেল দস্তগীর জাতীয় পতাকামণ্ডিত নজরুলের মরদেহ বহন করে সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গনে নিয়ে যান। বাংলাদেশে তার মৃত্যু উপলক্ষে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয় এবং ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

রাজনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য নজরুলের অনুভূতিশীল সাহিত্য অর্থাৎ নজরুলের লেখা সাহিত্য নির্ভর ‘সেকেন্ডারি ডেটা’ বিশ্লেষণ মূলক গবেষণা প্রবন্ধ রচনার কাজ নয়, আমার কাজ হল নজরুলের দর্শনের উৎসে পৌঁছনো। বিদ্রোহই শুধু তাঁর কবিতার কেন্দ্র জুড়ে অবস্থান করেনি, প্রেম ও প্রকৃতি, শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, সাম্য, ভ্রমণ, বিবিধ বিষয় তাঁর লেখায় ধরা পড়েছে। কবিতায় প্রিয়তমাকে উদ্দেশ্য করে কবি বলছেন, ‘যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,/ অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে/ বুঝবে সেদিন বুঝবে।’ এঁদের সমকালে উপেক্ষিত হলেও কিছু যায় আসে না। কারণ এঁরা যে কর্মে লিপ্ত আছেন, তা তুচ্ছ যশের জন্য নয় – আপন মানসিক ধর্মের কারণে। নদীকে কেউ যদি বলে নদী , তুমি কেন বয়ে যাচ্ছ ? নদী বলবে, বয়ে যাওয়ায় আমার জীবন। তাই সাধকরা সেই নদীর মতো। নজরুল ইসলাম সেই বহতা নদীর মতোই একজন মানুষ।

সারসমাপ্তিঃ এ সকল খ্যাতিমান মানুষের কীর্তি সমূহ অল্প কথায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তাঁরা সারাজীবনে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মান উন্নয়নে অবদান রেখেছেন বিভিন্ন ভাবে। আমি শুধু একজন পর্যটক ও ভ্রমণপ্রেমী মানুষ হিসেবে তাদের জীবনের কিছু গল্প তুলে ধরেছি। যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পর্যটন শিল্প এবং পর্যটক তৈরিতে যুগযুগ ধরে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। অথচ আমরা তাদের এই অসাধারণ কীর্তিটাকে ঢেকে ফেলি অন্য কোন খ্যাতির আড়ালে। আমি সেই পর্দাটাকে সরিয়ে পর্যটন প্রেক্ষাপটে তাঁদেরকে আপনাদের সামনে আনার চেষ্টা করেছি মাত্র।

লেখকঃ কিশোর রায়হান
পরিচালক অপারেশন
বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরারস এসোসিয়েশন–বিটিইএ
পরিচালক
বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন